যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে এর প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের সাফল্যের পেছনে ডব্লিউএইচওর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিকাদান কর্মসূচি থেকে শুরু করে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি প্রতিক্রিয়া এবং ল্যাবরেটরি সহায়তা—সব ক্ষেত্রেই সংস্থাটির সহযোগিতা ছিল অপরিহার্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব কার্যক্রম সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন মনে করেন, ডব্লিউএইচওর কার্যক্রম সংকুচিত হলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য তা বড় ধাক্কা হবে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণার বাজেট কমে গেলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে। সাবেক স্বাস্থ্য পরিচালক বে-নজির আহমেদও সতর্ক করেছেন, তহবিল কমে গেলে যে রোগগুলো নির্মূল হয়েছে বা নির্মূলের পথে রয়েছে, সেগুলো আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর অবদান দীর্ঘদিনের। পোলিও, ফাইলেরিয়া ও কালাজ্বর নির্মূলে সংস্থাটি কারিগরি সহায়তা দিয়েছে। হাম ও রুবেলা নির্মূলে টিকা কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। ২০২৩ সালে ইউনিসেফ, গ্যাভি ও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে এইচপিভি টিকা কর্মসূচি শুরু হয়েছিল, যাতে প্রায় এক কোটি কিশোরী বিনামূল্যে টিকা পেয়েছিল। ২০২৫ সালে প্রায় পাঁচ কোটি শিশুকে টাইফয়েড টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ডব্লিউএইচওর সহায়তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড মহামারির সময় দ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহ এবং মহামারি মোকাবিলায় নির্দেশনা তৈরির ক্ষেত্রেও সংস্থাটি বড় ভূমিকা রেখেছিল।
ডব্লিউএইচওর মহামারি ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম বাংলাদেশকে দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করেছে, যা কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজে লেগেছে। এছাড়া জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন, গবেষণা, উপকরণ ও পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রেও সংস্থাটির অবদান রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের শুরুতে সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ, ভ্যাকসিন প্ল্যান্ট স্থাপন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কমিউনিটি ক্লিনিককে জনস্বাস্থ্য সেবার মূল কেন্দ্রে রূপান্তরের জন্য ডব্লিউএইচওর সহায়তা চাওয়া হয়েছিল।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার ফলে ডব্লিউএইচও তহবিল সংকটে পড়েছে। সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসাস জানিয়েছেন, ইতোমধ্যেই কিছু কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়েছে। জাতিসংঘও বলেছে, ভাইরাস ও রোগ সংক্রমণ রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য, আর ডব্লিউএইচও সেই সহযোগিতার প্রধান প্ল্যাটফর্ম।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য প্রায় পাঁচ দশকের। উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে টিকাদান কর্মসূচি পর্যন্ত ডব্লিউএইচওর অবদান রয়েছে। এখন যদি তহবিল সংকটে এসব কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে জনস্বাস্থ্য বড় বিপদের মুখে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে এখনই এ বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। নতুন সরকারকে বিকল্প অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ বাজেট বাড়াতে হবে। নইলে স্বাস্থ্য খাতের অর্জনগুলো হুমকির মুখে পড়বে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউএইচও থেকে বেরিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য বড় ধাক্কা। টিকাদান, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি প্রতিক্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি সংকুচিত হতে পারে। তাই বিকল্প অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।