বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট (আইপিআই)। সংস্থাটি রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাংবাদিকদের অবাধ ও নিরাপদভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে মুক্ত গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য।
৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইপিআই বলেছে, “স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সাংবাদিকদের ভয়ভীতি, হামলা বা বাধা ছাড়া কাজ করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।”
১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত এই নির্বাচনটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনে সরকারের সহিংস দমন-পীড়নের পর দেশ ত্যাগ করলে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নতুন সরকারের গঠন নির্ধারিত হবে।
তবে ভোটের আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত ডিসেম্বরে ঢাকায় দেশের শীর্ষ দুটি দৈনিক—ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, ডিসেম্বর ও জানুয়ারির মধ্যে অন্তত ১৬টি ঘটনায় সাংবাদিকরা শারীরিক হামলা বা পেশাগত কাজে বাধার শিকার হয়েছেন। অনেক সাংবাদিকই নির্বাচনি কভারেজে নামতে ভয় পাচ্ছেন।
আইপিআই’র গ্লোবাল অ্যাডভোকেসি অফিসার রোয়ান হামফ্রিস বলেন, “বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এটি একটি সংকটময় মুহূর্ত। সব রাজনৈতিক দলকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সম্মান করতে হবে এবং সাংবাদিকদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বছরের পর বছর গণতান্ত্রিক পশ্চাৎপদতা ও গণমাধ্যমের ওপর হামলার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা বন্ধ করার এখনই সময়।”
অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ারও সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের সুরক্ষায় দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখাতে পারেনি।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস এসোসিয়েশন (সিজেএ) নির্বাহী কমিটির সদস্য সৈয়দ বদরুল আহসান বলেছেন, নির্বাচন ঘিরে দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তীব্র হচ্ছে। বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ভোটের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমে গেছে। ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তার মতে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত থাকলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ছে। রাস্তায় সংঘর্ষ, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা নির্বাচনের পরিবেশকে আরও ভঙ্গুর করে তুলছে।
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দ্রুত ফিরে আসবে না। একটি দুর্বল সরকার ক্ষমতায় এলে পরবর্তী সময়ে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। আওয়ামী লীগের প্রায় ৩৫–৪০ শতাংশ সমর্থক ভোটে অংশ না নিলে নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না বলেও মত দেন তারা।
সব মিলিয়ে, দেশজুড়ে নির্বাচনকে ঘিরে উদ্বেগ, সহিংসতার আশঙ্কা এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তাহীনতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, অবাধ সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।