২০২৫ সাল বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য ছিল একদিকে শোকের, অন্যদিকে সহিংসতার বছর। একাধিক গুণী শিল্পী ও অভিনেতা প্রয়াত হয়েছেন, পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে ভয়াবহ মব আক্রমণ ঘটেছে। বছর শেষে ফিরে তাকালে দেখা যায়, আনন্দের চেয়ে বেদনার পাল্লাই ভারী।
চলতি বছরে সংস্কৃতি অঙ্গন হারিয়েছে একাধিক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব। যাদের মধ্যে আছেন,
- সন্জীদা খাতুন (২৫ মার্চ): ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।
- মুস্তাফা জামান আব্বাসী (১০ মে): সংগীত শিল্পী, গবেষক ও লেখক, ফোক মিউজিক রিসার্চ গ্রুপের নেতৃত্ব দিয়েছেন দীর্ঘ ৫০ বছর।
- ফরিদা পারভীন (১৩ সেপ্টেম্বর): কিংবদন্তি লালনকন্যা, লালনগীতিকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন।
- অঞ্জনা রহমান (৪ জানুয়ারি): প্রায় ৩ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করা নৃত্যশিল্পী থেকে নায়িকা।
- প্রবীর মিত্র (৫ জানুয়ারি): রুপালি পর্দার নবাবখ্যাত অভিনেতা।
- জীনাত রেহানা (২ জুলাই): কালজয়ী গান সাগরের তীর থেকে–এর শিল্পী।
- গুলশান আরা আহমেদ (১৫ এপ্রিল): চলচ্চিত্র ও টিভি অভিনেত্রী, ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এ জনপ্রিয়।
- এ কে রাতুল (২৭ জুলাই): ব্যান্ড ‘ওন্ড’-এর ভোকালিস্ট, প্রয়াত নায়ক জসীমের পুত্র।
- জাহানারা ভূঁইয়া (২৫ আগস্ট): অভিনেত্রী, গীতিকার ও নারী চলচ্চিত্র পরিচালক।
- জেনস সুমন (২৮ নভেম্বর): জনপ্রিয় গান একটা চাদর হবে–এর গায়ক।
- শেখ নজরুল ইসলাম (২২ নভেম্বর): নির্মাতা।
- সাঙ্কু পাঞ্জা (২৯ মে): খল অভিনেতা।
- তানিন সুবহা (১০ জুন): তরুণ অভিনেত্রী, হৃদরোগে মৃত্যুবরণ।
তাদের প্রয়াণে সংস্কৃতি অঙ্গন শূন্যতায় ভরে গেছে।
২০২৫ সালে শুধু মৃত্যু নয়, সহিংসতাও কাঁপিয়ে দিয়েছে সংস্কৃতি অঙ্গন। ডিসেম্বর মাসে একাধিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে ভয়াবহ মব আক্রমণ হয়।
- ছায়ানট সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (ধানমন্ডি): ১৯ ডিসেম্বর ভোরে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা ভবন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
- প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার অফিস: ১৮–২০ ডিসেম্বরের মধ্যে একাধিকবার হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়। সাংবাদিকরা আক্রান্ত হন।
- নিউ এজ সম্পাদক: ব্যক্তিগতভাবে হামলার শিকার হন, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
- উদীচীসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠন: একই সময়ে হামলার শিকার হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক আইরিন খান এ ঘটনাগুলোকে “গণমাধ্যম ও শিল্পের স্বাধীনতার ওপর ভয়াবহ আক্রমণ” বলে অভিহিত করেছেন।
২০২৫ সালকে তাই সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য দ্বিমুখী প্রতিঘাতপূর্ণ বছর বলা যায়। একদিকে কিংবদন্তি শিল্পী ও অভিনেতাদের মৃত্যুতে শোক, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে মব আক্রমণ। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব ঘটনা।