মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনার মধ্যে আবারও আলোচনায় এসেছে হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই সরু জলপথ বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে বলে দাবি করছে এবং সেখানে নৌমাইন পেতে রাখা হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। এর উত্তরে রয়েছে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে থাকা এই প্রণালীর সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র প্রায় ২১ মাইল প্রশস্ত, আর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ মাইল।
এই জলপথের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে আটটি দেশ। এগুলো হলো ইরান, ওমান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং ইরাক। এদের প্রায় সবাই তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ দেশ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি রপ্তানির প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালী।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এই প্রণালীর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত বছর প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও জ্বালানি এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়েছে।
শুধু তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ক্ষেত্রেও এই প্রণালী গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতার তাদের প্রায় সব গ্যাস এই প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠায়। বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এই জলপথ দিয়ে যায়।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার মূল কারণ ইরানকে ঘিরে তৈরি হওয়া সামরিক সংঘাত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর পশ্চিম এশিয়ায় বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান।
এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্চের শুরুতে ইরান ঘোষণা দেয় যে তারা হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশটির পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ ওই জলপথ ব্যবহার করার চেষ্টা করলে তা হামলার মুখে পড়তে পারে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ইতোমধ্যে প্রণালীর কিছু অংশে নৌমাইন পেতে রেখেছে। ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনে এই এলাকায় একাধিক জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে গুজরাটগামী একটি থাইল্যান্ডের পণ্যবাহী জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। ওই ঘটনায় জাহাজের বেশ কয়েকজন নাবিককে উদ্ধার করা গেলেও কয়েকজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক অবস্থানই ইরানকে এখানে বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। প্রণালীর উত্তর দিকের বড় অংশজুড়ে ইরানের উপকূল রয়েছে। ফলে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই এলাকায় তাদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি।
তবে আন্তর্জাতিক আইনে হরমুজ প্রণালীকে আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত সব দেশের জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পারে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের উপকূল থেকে প্রায় ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত জলসীমায় নিয়ন্ত্রণ দাবি করতে পারে।
এই নিয়ম অনুযায়ী হরমুজ প্রণালীর সরু অংশে ইরান ও ওমান উভয়েরই আংশিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে সামরিক সক্ষমতা ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাস্তবে ইরানের প্রভাব বেশি বলে মনে করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি দীর্ঘ সময় ধরে এই জলপথে উত্তেজনা বা অবরোধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে এবং তা ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে এবং তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।