বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি বহুবার দেওয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মানুষ আশা করেছিল দূষণমুক্ত, সবুজ ও শান্ত একটি দেশের। নদীতে ডলফিন খেলবে, নগরবাসী ঘুম ভাঙবে পাখির কিচিরমিচিরে, মাটি-পানি প্লাস্টিকে দূষিত হবে না—এমন স্বপ্নই দেখানো হয়েছিল। কিন্তু দেড় বছর পর সেই স্বপ্ন রয়ে গেছে কাগজে-কলমে।
বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণ বহুমাত্রিক। পলিথিন ব্যবহার, নদী দখল ও দূষণ, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ—সবই নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
২০০২ সালে দেশে পলিথিন নিষিদ্ধ হলেও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তা আবার ফিরে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে সুপারশপ ও কাঁচাবাজারে পলিথিন ব্যাগ বন্ধের নির্দেশ দিলেও বাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং ব্যবহার বেড়েছে।
নদীদূষণ ঠেকাতে শিল্পকারখানাকে ইটিপি চালুর নির্দেশ দেওয়া হলেও শীত মৌসুমে নদীর পানি আবার কালো হয়ে গেছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা করা হলেও হর্নের তাণ্ডব থামেনি। বায়ুদূষণ কমাতে ঘাস লাগানো, পুরোনো বাস স্ক্র্যাপ করা এবং রাস্তার ধুলা নিয়ন্ত্রণে টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবায়ন হয়নি কিছুই।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুর মান এখন ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (একিউআই) ঢাকার অবস্থান বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় চতুর্থ। শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে ঢাকার একিউআই ছিল ২০৪। পাকিস্তানের লাহোর, ভিয়েতনামের হ্যানয় ও মিশরের কায়রো যথাক্রমে প্রথম তিনটি স্থানে রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী পিএম২.৫ কণার বার্ষিক গড় মাত্রা ৫ মাইক্রোগ্রাম হওয়া উচিত, অথচ ঢাকার গড় মাত্রা ৭৮ মাইক্রোগ্রাম—মানদণ্ডের তুলনায় প্রায় ১৫ গুণ বেশি।
বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে মাত্র ০.৩ শতাংশ অবদান রাখলেও রাজধানী নিয়মিতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় থাকে।
বায়ুদূষণের কারণে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের ক্যানসার, নিউমোনিয়া এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিইউপিডি) দ্রুত বাড়ছে। শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে বায়ুদূষণ মানুষের আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে।
শব্দদূষণও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। রাজধানীতে প্রতিদিনের হর্নের তাণ্ডব মানুষের মানসিক চাপ, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
নদীদূষণ ও পলিথিন ব্যবহারের কারণে পানির মান নষ্ট হচ্ছে, যা খাদ্যশৃঙ্খল ও জনস্বাস্থ্যে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিবেশ রক্ষায় একাধিক ঘোষণা দিয়েছিল। পলিথিন বন্ধ, নদী দখলমুক্ত করা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, বায়ুদূষণ কমানো—সবই ছিল প্রতিশ্রুতির অংশ। কিন্তু বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ কার্যকর হয়নি।
পরিবেশ উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন, ঢাকার প্রতিটি বাস যেন চলন্ত দূষণ-কারখানা। আইন সংশোধন ও বিধিমালা তৈরিতে সময় গেলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ইটভাটা ভেঙে ফেলার পর বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লক সম্প্রসারণে উদ্যোগ দেখা যায়নি। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পচনশীল ব্যাগ বাজারে আনতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
পরিবেশবিদরা বলছেন, অরাজনৈতিক সরকার হওয়ায় জনবান্ধব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রত্যাশা ছিল বেশি। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলনের সভাপতি মো. আবদুস সোবহান বলেন, “বর্তমান পরিবেশ উপদেষ্টার কাছে প্রত্যাশা ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তিনি শুধু আইন সংশোধন ও বিধিমালা তৈরিতেই সময় কাটিয়েছেন।”
পরিবেশ রক্ষায় সরকারের তর্জনগর্জন থাকলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দূষণ কমেনি, বরং বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য এখন সবচেয়ে বড় সংকটে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঢাকার অবস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবেশ দূষণ মোকাবিলা এখন আর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়। সাহসী সিদ্ধান্ত ছাড়া দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।