সর্বশেষ

শিক্ষার্থীদের সহিংসতা

সাভারের ঘটনায় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর সংকটের সংকেত

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২৫, ০২:৪৪
সাভারের ঘটনায় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর সংকটের সংকেত

সাভারে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয় বরং এটি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক ও সাংগঠনিক দুর্বলতার নগ্ন প্রকাশ। তুচ্ছ একটি ঘটনার সূত্র ধরে দুই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যেভাবে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছে, তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।

 

ঘটনার সূত্রপাত হয় একটি হোস্টেলের সামনে থুথু ফেলার মতো সামান্য বিষয় থেকে। এরপর বাগ্‌বিতণ্ডা, হামলা, পাল্টা প্রতিশোধ, এবং রাতভর ধ্বংসযজ্ঞে রূপ নেয়। সিটি ইউনিভার্সিটির প্রশাসনিক ভবন, উপাচার্যের কক্ষ, যানবাহন, কম্পিউটার, নথিপত্র সবকিছুই হামলার শিকার হয়। শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন, কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়। এমন ঘটনা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটতে পারে এটিই কল্পনাতীত।

 

এই সহিংসতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়, এটি মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও নেতৃত্ব গঠনের ক্ষেত্রও। কিন্তু যখন শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধভাবে সহপাঠীদের ওপর হামলা চালায়, প্রশাসনিক ভবনে আগুন দেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে আমরা কী ধরনের নাগরিক তৈরি করছি?

 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা এখানে স্পষ্ট। দুই প্রতিষ্ঠানের প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। রাতভর চলা হামলায় কেউ হস্তক্ষেপ করেনি, এটি শুধু নিরাপত্তার ব্যর্থতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতাও।

 

সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষকদের দাবি, তারা বারবার প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন, কিন্তু কেউ আসেনি। ছাত্রী হলের শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে ছিলেন। অন্যদিকে, ড্যাফোডিল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তাদের শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে মারধর করা হয়েছে, জোর করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে, দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেছে। ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা সহায়তা, তদন্ত সবই আলোচনায় এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আলোচনা কতটা কার্যকর হবে? ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?

 

এই ঘটনার সামাজিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। একটি দেশের শিক্ষার্থীরা যদি নিজেদের মধ্যে এমন সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিদেশি শিক্ষার্থী, গবেষণা সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

এখানে শিক্ষার্থীদের দায় যেমন রয়েছে, তেমনি দায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলার জন্য পাঠ্যক্রমে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর সংকট ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা উচিত।

 

এই ঘটনার পর সিটি ইউনিভার্সিটি এক সপ্তাহের জন্য একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে। এটি হয়তো পরিস্থিতি শান্ত করতে সহায়ক হবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার। শিক্ষার্থীদের আচরণ, প্রশাসনের প্রস্তুতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।

 

সাভারের এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, উচ্চশিক্ষা শুধু ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা। আমরা যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিকতা, সহনশীলতা ও নেতৃত্ব গড়ে তুলতে ব্যর্থ হই, তাহলে ভবিষ্যতের সমাজ হবে আরও বিভক্ত, আরও সহিংস।

 

এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দোষীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী মানে হবে নেতৃত্ব, জ্ঞান ও মূল্যবোধের প্রতীক—সহিংসতার নয়।

সব খবর

আরও পড়ুন

সমালোচনার মুখে এমপিও আবেদন রিভিউ করবে সরকার

সমালোচনার মুখে এমপিও আবেদন রিভিউ করবে সরকার

সাত বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য ও ইউজিসিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ

প্রত্যেকেই বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনে পদধারী সাত বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য ও ইউজিসিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ

আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চিঠি আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ

নির্বাচনের প্রাক্কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খানের পদত্যাগের ঘোষণা

নির্বাচনের প্রাক্কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খানের পদত্যাগের ঘোষণা

ঘুষ–বাণিজ্যের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষা মন্ত্রণালয়

বিদায়বেলায় ‘রকেট গতিতে’ এমপিও ঘুষ–বাণিজ্যের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষা মন্ত্রণালয়

সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের শিক্ষকদের বিবৃতি সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না

বই বিতরণে বিশৃঙ্খলা, নীতিতে স্থবিরতা, নেতৃত্বহীনতায় গভীর সংকট

শিক্ষা খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বৈব ব্যর্থতা বই বিতরণে বিশৃঙ্খলা, নীতিতে স্থবিরতা, নেতৃত্বহীনতায় গভীর সংকট

তীব্র শিক্ষক সংকটে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ

চাহিদার এক-ষষ্ঠাংশ পেলেন নিয়োগ সুপারিশ তীব্র শিক্ষক সংকটে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ