ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে (ইউএপি) উদ্ভূত পরিস্থিতির জেরে দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার পর এবার অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ক্লাস স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ। হিজাব ও নিকাব বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া মন্তব্য এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ ঘিরে এই সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, অভিযুক্ত শিক্ষকদের বক্তব্য এবং শিক্ষক সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে ঘটনাটি একাধিক মাত্রায় আলোচিত হচ্ছে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের সই করা এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, “বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া অনুকূল নয়।” পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব শ্রেণি কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।

এর আগের দিন, রোববার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর এবং একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. এ. এস. এম. মহসিনকে চাকরিচ্যুত করার ঘোষণা দেয়। শিক্ষার্থীদের একটি অংশের অভিযোগ, লায়েকা বশীর হিজাব ও নিকাব পরা মুসলিম শিক্ষার্থীদের অবমাননা করেছেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন এবং বৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন। অপরদিকে, ড. মহসিনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত ১০ ডিসেম্বর লায়েকা বশীরের একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে। ওই পোস্টে তিনি মুখ ঢেকে পর্দা করার প্রবণতা নিয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্য করেন এবং এটিকে নিরাপত্তা ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করেন। পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের একাংশ দাবি করে, পোস্টের ভাষা ইসলামবিদ্বেষী এবং এটি তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। পরে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ, সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করে দুই শিক্ষকের অপসারণ দাবি করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, অভিযোগের ভিত্তিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়। উপাচার্য কামরুল আহসান বলেন, “শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে নয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার্থীদের পোশাক নিয়ে মন্তব্য করায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে- এ বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।”

অভিযুক্ত শিক্ষক লায়েকা বশীর দাবি করেন, তাঁর পোস্ট ছিল ব্যক্তিগত মতামত এবং ধর্ম অবমাননার উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি বলেন, তদন্ত চলাকালে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একইভাবে ড. মহসিন অভিযোগ করেন, কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই তাঁকে অপসারণ করা হয়েছে এবং এটি ‘মবের চাপে’ নেওয়া সিদ্ধান্ত।
ঘটনাটি ঘিরে শিক্ষক সমাজেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এক বিবৃতিতে বলেছে, “চিন্তা ও আদর্শের পার্থক্যের কারণে দঙ্গলবাজির মাধ্যমে শিক্ষকের একাডেমিক স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে।” সংগঠনটি এই সিদ্ধান্তকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক নিন্দনীয় নজির হিসেবে আখ্যা দেয়।
অন্যদিকে, আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এটি কোনো ‘মব সন্ত্রাস’ নয়; বরং দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও অবমাননার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ। তাদের দাবি, একাধিক শিক্ষার্থী তদন্ত কমিটির কাছে অভিযোগ দিয়েছেন এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে একাডেমিক স্বাধীনতা, ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই বহিষ্কার, আন্দোলনের চাপ, এবং প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এসব মিলিয়ে ঘটনাটি বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও মতপ্রকাশের সীমা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বর্তমানে ক্লাস স্থগিত থাকায় শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মুখে। কর্তৃপক্ষ বলছে, আলোচনা ও সমাধানের মাধ্যমে দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। তবে এই সংকট কীভাবে নিষ্পত্তি হয় এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা নিয়ে নজর রাখছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজ।