দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণে খেলাপির হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী কোটি টাকার বেশি ঋণসংবলিত অ্যাকাউন্টে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ২০ শতাংশ। এক বছর আগে একই সময়ে এ হার ছিল ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে কোটি টাকার বেশি ঋণসংবলিত অ্যাকাউন্টে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ ৫৪ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে ঋণ শ্রেণিকরণে নতুন নীতিমালা চালুর পর থেকেই প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আগে কোনও ঋণ ১৮০ দিন অনাদায়ী থাকলে খেলাপি হিসেবে গণ্য করা হতো, নতুন নিয়মে সেই সময়সীমা কমিয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে।
তবে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমেছে। সেপ্টেম্বর শেষে এই হার ছিল ৩৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নীতি সহায়তা এবং ঋণ অবলোপনের ক্ষেত্রে কিছু শিথিলতা দেওয়ায় এ সামান্য কমতি এসেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনও ঋণ ‘মন্দ মানে’ শ্রেণিকৃত হওয়ার পরই তা অবলোপন করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আগে দুই বছর অপেক্ষার পর করা যেত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নীতি সহায়তার সুযোগে বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। ফলে একটি উল্লেখযোগ্য অঙ্ক সাময়িকভাবে খেলাপি তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তা না হলে ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারতো।
ব্যাংকারদের মতে, গত দেড় বছরে খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ হলো এতদিন আড়ালে থাকা ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসা। অতীতে বিভিন্ন কৌশলে অনাদায়ী ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানোর সুযোগ ছিল, যা এখন অনেকাংশে বন্ধ হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি অডিট ফার্মের মাধ্যমে কয়েকটি ব্যাংকের সম্পদ যাচাইয়ের ফলে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পাচ্ছে।
বিশেষ করে একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক নিয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিগত দেড় দশকে ব্যাংক খাতে যেসব অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার প্রতিফলন এখনকার খেলাপি ঋণের চিত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও হলমার্ক গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিপুল অঙ্কের ঋণ বর্তমানে খেলাপি অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির প্রভাবও এখনও কাটেনি।