২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগের পতনের পর সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে দেশের বেসরকারি খাত। বড় শিল্পগোষ্ঠী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—সবাই এখন আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, ‘দোসর খোঁজার’ নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করা হচ্ছে বহু শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীকে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বিগত সরকারের কোনো নেতা বা মন্ত্রীর সঙ্গে একটি ছবি থাকলেই কাউকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে মামলা, হয়রানি ও সামাজিক চরিত্রহননের শিকার করা হচ্ছে। মিথ্যা মামলা, ব্যাংক হিসাব জব্দ, চাঁদাবাজি এবং অনলাইনে অপপ্রচারের কারণে ব্যবসায়ী সমাজে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো দেশে ব্যবসা করতে গেলে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বাস্তবতার অংশ। লাইসেন্স, গ্যাস সংযোগ বা ব্যাংক সুবিধা—সব ক্ষেত্রেই সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন হয়। গত ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে অনেক উদ্যোক্তা বাধ্য হয়েই সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছেন। এখন সেই বাস্তবতাকেই অপরাধ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র দশমিক ১ শতাংশে—যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এমনকি কভিড মহামারির সময়েও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ছিল দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ, সেখানে ধারাবাহিক পতনে এখন কার্যত বিনিয়োগ খরা চলছে।
অন্যদিকে, ব্যাংক লুট ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আসেনি, বরং প্রকৃত উদ্যোক্তারাই বেশি চাপে পড়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প নয়, কেবল বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন। শিল্প সম্প্রসারণ থেমে গেছে, ব্যাংক ঋণের চাহিদা নেমে এসেছে প্রায় শূন্যে, পুঁজিবাজারেও নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিশোধের বদলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না গড়া গেলে দেশের বেসরকারি খাত এবং কর্মসংস্থান—উভয়ই গভীর সংকটে পড়বে।