বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে বিশ্বব্যাংক-এর ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ‘লাল তালিকায়’ রয়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্যদ্রব্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
বিশ্বব্যাংক বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যস্ফীতির চিত্র গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত প্রকাশ করলেও দেশের হালনাগাদ পরিস্থিতি তুলে ধরেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.৩০ শতাংশ, যা গত ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই হার ছিল ১০.৭২ শতাংশ। মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক পাঁচ মাস ধরে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত খাতেও মূল্যস্ফীতি কম নয়; ফেব্রুয়ারিতে এ খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯.১ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। কারণ তাদের আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় খাদ্য কেনায়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের মোট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত খাবারের পেছনে চলে যায়। ফলে খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
সহজ হিসাবে দেখা যায়, এক বছর আগে যে পরিমাণ খাদ্য কিনতে ১০০ টাকা লাগত, এখন একই পরিমাণ খাদ্য কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১০৯ টাকা ৩০ পয়সা। অতিরিক্ত এই ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে অনেক পরিবারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ খাদ্য তালিকা সংকুচিত করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি অনেকটা ‘অদৃশ্য কর’-এর মতো কাজ করে। আয় অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি বজায় থাকলে তা দারিদ্র্য বৃদ্ধির পাশাপাশি পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির দেশগুলোকে বিভিন্ন রঙে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ‘বেগুনি’ শ্রেণি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ‘লাল’ শ্রেণি উচ্চঝুঁকির নির্দেশ করে। বর্তমানে বাংলাদেশ এই লাল তালিকায় অবস্থান করছে, যা পরিস্থিতির গুরুতর দিকটি তুলে ধরে।
একই সময়ে মালাউয়ি, ইরান, জাম্বিয়া, তুরস্ক ও আর্জেন্টিনার মতো কয়েকটি দেশ আরও উচ্চঝুঁকির পর্যায়ে রয়েছে। তবে কিছু দেশ নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে ঝুঁকির স্তর কমাতে সক্ষম হয়েছে।
সার্বিকভাবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতির এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি শুধু একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।