পবিত্র রমজান মাস শুরু হতেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন কাঁচাবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। ইফতার সামগ্রী থেকে শুরু করে ফল, মাছ ও মাংস—প্রায় সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে দাম। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ পড়েছেন চাপে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রোজার দ্বিতীয় দিনেই ইফতার ও রান্নাঘরের বাজারে আগুন।
ইফতার সামগ্রীর বাজারে অস্বস্তি
রাজধানীর কাওরান বাজার, ফার্মগেট, বেইলি রোড, বনশ্রী ও সেগুনবাগিচা এলাকায় ইফতার সামগ্রীর জমজমাট পসরা বসেছে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, সংযমের এই মাসের শুরুতেই খেজুর, লেবু, বেগুন, শসা ও কাঁচা মরিচের দাম নাগালের বাইরে চলে গেছে।
বড় আকারের লেবু প্রতি হালি ১২০ টাকা এবং ছোট লেবু ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক দিন আগেও ছিল ৪০-৬০ টাকার মধ্যে। বেগুনের কেজি ১০০ থেকে ১৬০ টাকা; গোল বেগুন ১৬০ এবং লম্বা বেগুন ১৩০-১৪০ টাকায়। শসা সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়ে ১২০ টাকা কেজি হয়েছে। কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে।
ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ খেজুরের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি। ‘জাহিদী’ খেজুর ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি, সুদাই ৭৫০-৮০০, কালমি মরিয়ম ৮৫০-৯০০, মাবরুম মরিয়ম ৮৫০-৯৫০, সুকারি ৯২০-৯৫০, আজওয়া ৯৫০-১০০০, ইরানি মরিয়ম ১২৫০-১৪০০ এবং প্রিমিয়াম মেডজুল ১৬৫০-১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় কিছু খেজুরে কেজিপ্রতি ১০০-১৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে।

তবে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে চিনি ও ইসবগুলের ভুসিতে। চিনি কেজি ১০৫ টাকায় এবং ইসবগুলের ভুসি ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
ফার্মগেটের বাসিন্দা রাকিব হোসেন বলেন, “বাজারে ইফতার সামগ্রীর দাম আগুন। লেবু ও শসার দাম দেখে পরিমাণ কমিয়ে কিনতে হচ্ছে।” সেগুনবাগিচার খায়রুল হক জানান, সীমিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে অনেক পণ্য তালিকা থেকে বাদ দিতে হচ্ছে।
ইফতারির দোকানে ভিড়, দামও চড়া
বেইলি রোড ও কাওরান বাজার এলাকায় অস্থায়ী ও স্থায়ী দোকানগুলোতে ছোলা, বেগুনি, পিয়াজু, জিলাপি, হালিম, কাবাবসহ নানা পদের ইফতারি বিক্রি হচ্ছে। চিকেন পরোটা ৬০ টাকা, ডিমের চপ ৩০ টাকা, ছোলা ১৫০ টাকা কেজি, জিলাপি ২৩০ টাকা এবং হালিম ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পিয়াজু ও বেগুনি প্রতি পিস ১০ টাকা।
জনপ্রিয় একটি প্রতিষ্ঠানে কিমা পরোটা ১৫০ টাকা, মালাই কাবাব ১২০, ফিশ বল ৯০, বারবিকিউ চিকেন রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের দাবি, কাঁচামালের দাম বাড়ায় প্রস্তুত খাবারের দামও সমন্বয় করতে হয়েছে।
ফলের বাজারেও স্বস্তি নেই
রমজান এলেই ফলের চাহিদা বাড়ে। তবে এবার দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। আপেল ৩৮০-৪৪০ টাকা, কমলা ৩৫০, আনার ৫৬০, নাশপাতি ৪৪০, মালটা ৩০০-৩৫০, আঙ্গুর ৪৫০ টাকা কেজি। দেশি ফলের মধ্যে সবরি কলা ডজন ১২০, সাগর কলা ১২০-১৫০, পেঁপে ১৫০, পেয়ারা ১৩০-১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তরমুজ ১২০-১৫০ টাকা কেজি।
ফল ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর বলেন, আড়তেই দাম বেশি হওয়ায় খুচরা বাজারে কম দামে বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, রমজানকে কেন্দ্র করে দাম বাড়ানো যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

মাছ-মাংসের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি
রমজান শুরু হতেই মাছ ও মাংসের বাজারেও দাম বেড়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, সেগুনবাগিচা ও বনশ্রী এলাকায় দেখা গেছে, রুই, কাতলা ও মৃগেল ৩৫০-৪০০ টাকা কেজি। পাঙ্গাস ও তেলাপিয়া ৩০০-৩৫০ টাকা। ইলিশ আকারভেদে ১,২০০-১,৮০০ টাকা। পাবদা, টেংরা ও বোয়াল ১,২০০-১,৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গরুর মাংস ৭৫০-৮৫০ এবং খাসির মাংস ১,১০০-১,২০০ টাকা কেজি। ব্যবসায়ীদের দাবি, পাইকারি দাম, পরিবহন ব্যয় ও বরফের খরচ বাড়ায় খুচরা বাজারেও প্রভাব পড়ছে।
নজরদারির দাবি
ক্রেতাদের অভিযোগ, রমজান এলেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ান। নিয়মিত বাজার তদারকি ও সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা। অর্থনীতিবিদদের মতে, চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা এবং কার্যকর মনিটরিং না হলে পুরো মাসজুড়ে এই চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
রমজানের শুরুতেই নিত্যপণ্যের দামে এমন ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। সামনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।