ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের সিদ্ধান্ত শুধু একটি টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানো নয়; এটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ভবিষ্যৎকে দীর্ঘমেয়াদে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে। সরকার ও বিসিবির দাবি, বাংলাদেশ না খেললে বিশ্বকাপ ২০ কোটি দর্শক হারাবে। কিন্তু বাস্তবে এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট নিজেই।
আর্থিক বিপর্যয় ও রাজস্ব ক্ষতি
বিসিবি দাবি করছে, ২০২৭ সাল পর্যন্ত আইসিসি থেকে তাদের নির্ধারিত লভ্যাংশ সুরক্ষিত আছে। তবে বিশ্বকাপে অংশ না নিলে অংশগ্রহণ ফি ও সম্ভাব্য পুরস্কার অর্থ হারাতে হবে, যা ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নয়নের অন্যতম বড় উৎস। আরও বড় ধাক্কা আসতে পারে স্পনসরশিপে। ইতিমধ্যে এসজি ও এসএস-এর মতো ভারতীয় ক্রীড়া ব্র্যান্ড বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে। বিশ্বকাপ বয়কট হলে আন্তর্জাতিক স্পনসরদের বড় অংশ সরে যেতে পারে, কারণ বৈশ্বিক মঞ্চে দৃশ্যমানতাই তাদের বিনিয়োগের মূল কারণ।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ক্রিকেটারেরা। বিসিবি ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপে না খেলায় যে ম্যাচ পারিশ্রমিক তারা হারাবেন, তার কোনো ক্ষতিপূরণ বোর্ড দেবে না। এতে ক্রিকেটারদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিদ্রোহের ঝুঁকি বাড়ছে।
নির্বাসন ও আইসিসির শাস্তির আশঙ্কা
আইসিসির সঙ্গে প্রতিটি বোর্ডের একটি বাধ্যতামূলক ‘পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্ট’ রয়েছে। এই চুক্তি ভঙ্গ করলে আইনি ও ক্রীড়াগত শাস্তির মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। সম্ভাব্য শাস্তির মধ্যে রয়েছে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ও ভবিষ্যৎ আইসিসি টুর্নামেন্ট থেকে সাময়িক বহিষ্কার, র্যাঙ্কিং পয়েন্ট কাটা এবং সরাসরি বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা হারানো।
এ ছাড়া আইসিসি ইতোমধ্যে স্কটল্যান্ডকে বিকল্প দল হিসেবে প্রস্তুত রেখেছে। একবার বিকল্প দল চূড়ান্ত হলে বাংলাদেশের ফিরে আসার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে।
ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ারে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি
বিশ্বকাপই বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চ। এই সুযোগ হারালে আইপিএল, বিগ ব্যাশ বা এসএ২০-এর মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে ডাক পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে অনেক ক্রিকেটার অন্য দেশের নাগরিকত্ব বা ক্যারিয়ার বদলের কথাও ভাবতে পারেন যা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বড় ধাক্কা হবে।
কূটনৈতিক ও ক্রীড়ামঞ্চে একঘরে হওয়ার ঝুঁকি
আইসিসি যখন ভারতের ভেন্যুগুলোকে নিরাপদ ঘোষণা করেছে, তখন নিরাপত্তার অজুহাতে বয়কট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নেতিবাচক বার্তা দেবে যে বাংলাদেশ খেলাধুলার চেয়ে রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দেয়। এর ফলে ভবিষ্যতে বড় দলগুলো ঢাকা সফরের ব্যাপারে নতুন করে হিসাব কষতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিশ্বকাপ বয়কটের পরিণতি শুধু একটি টুর্নামেন্ট মিস করা নয়; এটি বাংলাদেশ ক্রিকেটকে আর্থিক, কূটনৈতিক ও ক্রীড়াগতভাবে দীর্ঘদিনের জন্য প্রান্তিক করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।