ঢাকাসহ সারাদেশে গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রমজান মাসে ইফতার ও সাহ্রির সময় রান্নার জন্য গ্যাস না থাকায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। রাজধানীর মগবাজার, বনশ্রী, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেলা গ্যাস থাকে না, রাতে সামান্য চাপ পাওয়া যায়। ফলে অনেক পরিবার ইলেকট্রিক চুলা বা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে।
বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০-৫০০ টাকা বেশি দিয়ে এলপিজি কিনতে হচ্ছে। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা খালিদ হোসেন জানান, ১২ কেজির সিলিন্ডার ১৩০৬ টাকার পরিবর্তে ১৮০০-২৪০০ টাকায় কিনতে হয়েছে।
তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানিয়েছেন, দেশে দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট। শিল্পে গ্যাস বাড়ালে বিদ্যুতে ঘাটতি হয়, বিদ্যুতে দিলে আবাসিকে টান পড়ে। উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া সংকট সমাধানের উপায় নেই।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় চালকরা চাহিদার অর্ধেক গ্যাস পাচ্ছেন না। তেজগাঁওয়ের অটোরিকশাচালক জসিম উদ্দিন বলেন, “ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পুরো গ্যাস পাওয়া যায় না। আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে।” সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সিএনজি স্টেশন প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
সাভার, গাজীপুরসহ শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানায় বয়লার ও ওয়াশিং মেশিন বন্ধ রয়েছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করায় খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। অকোটেক্স গ্রুপের কর্মকর্তা হোসাইন খালেক বলেন, “গ্যাস না থাকায় কারখানা প্রায় বন্ধ। ডিজেল দিয়ে চালাতে হচ্ছে, যা গ্যাসের দামের চেয়ে ছয় গুণ বেশি।”
দেশে সরবরাহকৃত গ্যাসের ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়। তবে চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, এপ্রিল-মে মাসে চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে। কিন্তু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে দৈনিক ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও বর্তমানে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৮০ কোটি ঘনফুট। ফলে লোডশেডিং বাড়তে পারে।
২০১৭ সালে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ছিল ২৭০ কোটি ঘনফুট, বর্তমানে তা কমে ১৮০ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুসন্ধানে অবহেলার কারণে দেশীয় উৎপাদন কমেছে। আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় ডলারের দাম ও গ্যাসের মূল্য বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সদ্য ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলা। ক্যাব উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, “আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে।” ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম বলেন, “বাংলাদেশে গ্যাসের সম্ভাবনা অনেক। ব্যাপক অনুসন্ধান চালাতে হবে।”
নতুন সরকার ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ও ২০৩০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের পথনকশা গ্রহণ করেছে। এতে ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি কূপ খনন এবং দিনে অতিরিক্ত ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে চতুর্থ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।