মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত টেকনাফের সেই শিশু হুজাইফা সুলতানা আফনান (১২) দীর্ঘ ২৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে মারা গেছে। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল প্রায় ৯টা ৪৫–৫০ মিনিটের দিকে রাজধানীর জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বিষয়টি পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। শোকাহত পরিবার সবার কাছে তার জন্য দোয়া চেয়েছে।
গত ১১ জানুয়ারি সকালে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিতে মাথায় বিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় আফনান। সে স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের মেয়ে। প্রথমে তাকে স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে একই দিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসকরা জানান, গুলিটি তার মাথার ভেতরে ঢুকে যায়। অস্ত্রোপচার করে মস্তিষ্কের চাপ কমানোর চেষ্টা করা হলেও ঝুঁকি বেশি থাকায় গুলি অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৩ জানুয়ারি তাকে ঢাকায় জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে টানা চিকিৎসার পরও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেস্থেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুন অর রশিদ সে সময় জানিয়েছিলেন, তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল এবং জীবনহানির আশঙ্কা ছিল প্রবল।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। মংডু টাউনশিপের আশপাশে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলা, ড্রোন হামলা, মর্টার শেল ও গোলাগুলির ঘটনা বেড়েছে। এসব সংঘর্ষের প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনপদে। টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় গোলার শব্দে ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠা, বসতঘর ও চিংড়িঘেরে গুলি এসে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
হুজাইফার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সীমান্তে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ও কার্যকর কূটনৈতিক এবং নিরাপত্তা পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক নেতারাও শোক প্রকাশ করে দায়ীদের জবাবদিহি ও সীমান্ত সুরক্ষায় দৃশ্যমান উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন।
একটি সীমান্ত সংঘাতের গুলিতে আরেকটি নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে যাওয়ায় মানবিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার প্রশ্ন আবারও সামনে চলে এসেছে।