দেশজুড়ে হামের উদ্বেগজনক প্রাদুর্ভাবে গত ১৯ দিনে উপসর্গ নিয়ে ৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ৭৯২ জন। পরিস্থিতি ঘিরে অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক, যদিও সরকার বলছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রোববার থেকে শুরু হচ্ছে দেশব্যাপী জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের আট বিভাগে ৯৪৭ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যাদের মধ্যে পরীক্ষায় ৪২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, “একটি শিশুও যেন টিকার বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।” টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়নে জড়িত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
৩০ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকা
প্রথম ধাপে দেশের ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা ও পৌর এলাকায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আনা হবে। আগে টিকা নেওয়া থাকুক বা না থাকুক, এই বয়সসীমার সব শিশুকেই টিকা দেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে জাতীয় টিকাদান বিষয়ক কারিগরি পরামর্শক কমিটি (এনআইটিএজি) এই জরুরি কর্মসূচির সুপারিশ করেছে। লক্ষ্য হলো দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আগামী ২১ মে’র মধ্যে এই কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, “৩০টি হটস্পট দিয়ে শুরু হলেও এটি চূড়ান্ত নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী ধাপে ধাপে আরও এলাকায় টিকাদান সম্প্রসারণ করা হবে।”
হাসপাতালে চাপ, বিকল্প ভাবনা
হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে শিশু হাসপাতালগুলোর আইসিইউতে চাপ বেড়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তবে প্রয়োজন হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত কুমার বিশ্বাস বলেন, “হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও সবাই হামে আক্রান্ত নয়। পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”
টিকা না পেলে বাড়ে ঝুঁকি
শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের পর নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী টিকা না পেলে শিশুদের মধ্যে হামসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, “সময়মতো টিকাদান না হলে শিশু নিউমোনিয়াসহ মারাত্মক জটিলতায় পড়তে পারে, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।”
অধ্যাপক ডা. সফি আহমেদ মোয়াজ জানান, শিশুদের জন্মের পরপরই বিসিজি টিকা দেওয়া হয়। এরপর ধাপে ধাপে পলিও, নিউমোনিয়া, টিটেনাস, হুপিং কাশি, ডিপথেরিয়া ও হেপাটাইটিসের টিকা দেওয়া হয়। ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম ও রুবেলার টিকা সম্পন্ন করা হয়।
আক্রান্তদের জন্য ভিটামিন ‘এ’
সরকার জানিয়েছে, হাম আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হবে। তবে সুস্থ শিশুদের শুধুমাত্র টিকা দেওয়া হবে, তাদের ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া হবে না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “যাদের হাম হয়েছে বা উপসর্গ রয়েছে, শুধু তাদেরকেই ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া হবে। সুস্থ শিশুদের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়।”

অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান
অভিভাবকদের উদ্দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অনুরোধ জানিয়েছেন, ৫ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে নির্ধারিত টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে। তবে যেসব শিশু অসুস্থ বা জ্বরে ভুগছে, তাদের সুস্থ হওয়ার পর টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
টিকাদান কার্যক্রম প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলবে। স্থানীয়ভাবে মাইকিংসহ বিভিন্ন মাধ্যমে টিকাকেন্দ্রের তথ্য জানিয়ে দেওয়া হবে।
আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে সচেতনতা ও অংশগ্রহণ জরুরি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা করোনার মতো পরিস্থিতিও সফলভাবে মোকাবিলা করেছি। আশা করি, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রচেষ্টায় এটিও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২০ সালের পর বড় আকারে টিকাদান কর্মসূচি না হওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে, যা বর্তমান প্রাদুর্ভাবের একটি বড় কারণ।
‘দায়ীদের জবাবদিহি’ দাবি
এদিকে অতীতে টিকা কার্যক্রমে অবহেলার অভিযোগ তুলে দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সন্তানহারা পরিবারগুলো। তাদের অভিযোগ, সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা গেলে অনেক শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো।
তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। অতীতের তদন্ত পরে করা হবে কি না, তা ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।