হে বঙ্গবাসী, আজিকার এই ঘোর কলিকালে বসিয়া যখন আমি আমার জীর্ণ ছাতাটি বগলে চাপিয়া বাজারের ভিড়ে কিংবা চায়ের দোকানের ধোঁয়ায় মুখ লুকাই, তখন এক পরম কৌতুকপ্রদ দৃশ্য আমার নয়নগোচর হয়। আপনারা যাহাকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করিয়াছেন বলিয়া আস্ফালন করেন, দেখা যাইতেছে— প্রতি সূর্যোদয়ে আপনারা তাহাকেই সযত্নে ফিনিক্স পাখির ন্যায় ভস্ম হইতে জাগাইয়া তুলিতেছেন। আপনাদের এই ‘ভুলিতে চাহিয়াও ভুলিতে না পারা’র যে নিদারুণ ব্যাধি, তাহা লইয়াই আজিকার এই কিঞ্চিৎ কচলাকচলি।
আজ যখন দূর প্রবাসে, অর্থাৎ সেই মরুভূমির তপ্ত বালুকা বেলায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দাবানলের ন্যায় ছড়াইয়া পড়িতেছে, তখন দেখি আমাদের দেশের নব্য বিপ্লবীদের মুখ চুন হইয়া গিয়াছে। ইরানের ড্রোন যখন আকাশপথে গর্জন করে আর মার্কিন-ইজরায়েলি মিত্ররা নাজেহাল হয়, তখন আরবের আমির-ওমরাহগণ বালিতে মুখ গুঁজিয়া প্রভুর আজ্ঞার অপেক্ষা করেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে, এই বাংলার বাতাসে একটি নাম হাহাকারের ন্যায় ভাসিয়া বেড়ায়। যাহারা কান পাতিয়া শোনেন, তাহারা শুনিতে পান— লোকচক্ষুর অন্তরালে কে যেন ফিসফাস করিয়া বলিতেছে, "আহারে! একজন নারী অন্তত দাঁড়াইয়া বুক ফুলাইয়া বলিতে পারিতেন— আমাদের দমাইয়া রাখা যাইবে না।" মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতে সম্মিলিত শক্তির যে স্বপ্ন তিনি দেখাইতেন, আজ সেই স্বপ্নের অভাবে আরবের শেখদের অসহায়ত্ব দেখিয়া আপনাদের অবচেতন মন সেই শেখ হাসিনাকেই খুঁজিয়া বেড়ায়। ব্যাঙ্গ তো এখানেই— যাহাকে আপনারা স্বৈরাচার বলিয়া গালি দেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাহার সেই ‘বাঘিনী’র ন্যায় গর্জনটি এখন আপনাদের বড্ড বেশি মিসিং মনে হইতেছে!
রাত্রির নিস্তব্ধতায় যখন হঠাৎ করিয়া বিজলি বাতিটি চলিয়া যায় আর আপনাদের কপালে ঘামের মুক্তা বিন্দু জমিতে থাকে, তখন সেই অন্ধকারের মধ্যেই আপনারা এক অলৌকিক জ্যোতির সন্ধান পান। চব্বিশ ঘণ্টার বিদ্যুতের যে বিলাসিতা আপনারা অনায়াসে ভোগ করিতেন, আজ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়িয়া তাহা ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ বলিয়া মনে হয়।
অফুরন্ত জ্বালানির নিশ্চয়তা আর সেই যে দূরদর্শী পাইপলাইনের গল্প— আজ বিদ্যুৎ সংকটের সময় সেই নামটাই আপনাদের জপমালা হইয়া গিয়াছে। লোকে এখন অন্ধকারে হাতড়াইয়া মোমবাতি খোঁজে না, বরং শেখ হাসিনার সেই ‘আলোর কারিগর’ ইমেজটি মনে করিয়া মনে মনে এক চিলতে ব্যাথা অনুভব করে। আপনারা তাহাকে প্রাসঙ্গিক করিতেছেন প্রতিটি ঘামের ফোঁটায়, প্রতিটি অন্ধকার মুহূর্তে!
সবচেয়ে আমোদজনক দৃশ্যটি পরিলক্ষিত হয় কাঁচাবাজারে। যখন মাছ-মুরগীর দাম শুনিয়া আপনাদের চক্ষু চড়কগাছ হয় আর এক পোয়া তেলের দামে পকেট গড়ের মাঠ হইয়া যায়, তখন আপনাদের রসনা হইতে নিঃসৃত হয় এক গভীর আক্ষেপ। কোটি মানুষ যখন আজ রেশন কার্ড আর ভাতার জন্য হাহাকার করে, তখন তাহাদের মনে পড়ে সেই একজনের কথা— যিনি দরিদ্রের কুটিরে সরকারি সামর্থ্য পৌঁছাইয়া দিবার এক অদ্ভুত কারিগরি জানিতেন।
যিনি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পঞ্চাশ বিলিয়নে তুলিয়া গ্রামিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করিয়াছিলেন, তাহার সেই ‘উন্নয়নের ম্যাজিক’ আজ আপনাদের কাছে দুঃস্বপ্ন বলিয়া মনে হইলেও— সত্য ইহাই যে, ডাল-ভাতের থালিতেও আপনারা আজ তাহাকেই খুঁজিয়া পাইতেছেন। সার সংকট আর বীজ সংকটের নিউজ যখন পত্রিকার ফুটনোটে স্থান পায়, তখন অবচেতন মন বলিয়া উঠে— "আহা! খাদ্য উৎপাদনে দেশটা তো একদা শীর্ষে উঠিয়াছিল!"
রমজান আসিলে কিংবা ঈদের আনন্দে যখন মঙ্গা নামক সেই অভিশপ্ত শব্দটি আপনাদের অভিধান হইতে মুছিয়া গিয়াছিল, আপনারা ভাবিয়াছিলেন ইহা বুঝি এমনিই হইয়াছে। কিন্তু আজ যখন পকেটের টানে ঈদের আনন্দ ম্লান হয়, তখন সেই কয়েক প্রজন্মের হিরোইনটির কথাই মনে পড়ে। মঙ্গাকে যিনি বাংলার মাটি হইতে চিরতরে বিদায় করিয়াছিলেন, তাহার সেই বিদায়টি এখন আপনাদের কাছে এক ‘চিরস্থায়ী হাহাকার’ হইয়া রহিয়াছে।
আপনারা আজ ডিজিটাল সেবার যে নতুন নতুন মোরক খুলিতেছেন, কারিগরি প্রশিক্ষণের যে লম্বা চওড়া বুলি আওড়াইতেছেন— একটু তলাইয়া দেখিলেই দেখিবেন, সেই পরিকল্পনার নীল নকশাটি কিন্তু তাহারই হস্তলিপি। আপনারা তাহাকে প্রাসঙ্গিক করিতেছেন তাহার সাজানো বাগানে বসিয়া তাহার গালিগালাজ করিয়া।
অতএব হে ভ্রাতৃগণ, আপনারা হাসিতে হাসিতে কুটি কুটি হউন আর আমাকে গালিই দিন— সত্য এই যে, আপনারা শেখ হাসিনাকে প্রাসঙ্গিক করিতেছেন আপনাদের প্রতিটি ব্যর্থতায়, প্রতিটি অভাবে এবং প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে। তিনি কেবল একটি নাম নহেন, তিনি আজ আপনাদের ‘অপ্রাপ্তির’ এক স্থায়ী শিরোনাম। তিনি বসিয়া রহিয়াছেন আপনাদের স্মৃতির সেই প্রকোষ্ঠে, যেখান হইতে বাহির হইবার কোনো পথ আপনারা আজ অবধি খুঁজিয়া পান নাই।
ইহাই আজিকার দিনের শ্রেষ্ঠ রসিকতা— আমরা যাহাকে সরাইয়া দিয়াছি, আমরাই তাহাকে প্রতি মুহূর্তে সিংহাসনে বসাইয়া দিতেছি আমাদের অবচেতন হাহাকারে!
লেখকঃ এক ক্লান্ত পেনসিল; কলমের কালি যাহার ব্যাঙ্গের নাচন বলিয়া ভ্রম হয়