‘এই যে আকাশ, দিগন্ত মাঠ, স্বপ্নে সবুজ মাটি
নীরবে মৃত্যু গেঁড়েছে এখানে ঘাঁটি।
কোথাও নেইকো পার,
মারী ও মড়ক, মন্বন্তর, ঘন ঘন বন্যার
আঘাতে আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন ভাঙ্গা নৌকার পাল,
এখানে দারুণ দু:খ কেটেছে সর্বনাশের খাল।’
: বোধন, সুকান্ত ভট্টাচার্য।
গত কয়েকদিন ধরেই বিপ্লবী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘বোধন’ কবিতার এই পংক্তি কয়টি মাথা থেকে তাড়াতে পারছিলাম না। ঠিক যেদিন থেকে পত্রিকায় হামে শিশুমৃত্যুর খবর আসতে শুরু করলো, সেদিন থেকেই কবিতাটি আমাকে কেমন প্রেতের মত তাড়া করে ফিরছে! অনেক পত্রিকা বা টিভিতে শিশুমৃত্যুর খবর কিছু কমিয়ে দেখানো হলেও ‘দৈনিক কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী (৯ই এপ্রিল, বৃহষ্পতিবার), সারা দেশে ৫৬ জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করে পত্রিকাটি জানাচ্ছে যে সারা দেশে মোট ১৩৮ শিশু হামের কারণে মারা গেছে এবং অন্তত ৯ হাজার হাম আক্রান্ত রোগী এখন বাঁচা-মরার দোলাচলে। বিগত দেড় বছওে সময়মতো রাজস্ব খাত থেকে টিকা কেনার বরাদ্দ নিশ্চিত না করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের টিকার ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা না দেওয়া, সর্বোপরি বিষয়টিকে একেবারেই গুরুত্ব না দিয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে বিগত প্রধান উপদেষ্টার অপেশাদারসুলভ আরচণই এখন কাল হয়েছে। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এসব বিষয়ে একেবারেই নির্লিপ্ত ছিলেন।
পত্রিকাটির মতে, দীর্ঘদিন ধরে টিকা সংগ্রহের যে স্বাভাবিক ধারা ছিল, তাতে দুর্নীতির অজুহাত তুলে তা বাতিল করা হয়। অথচ ওই প্রক্রিয়ায় ৬০ শতাংশ অর্থায়ন করত বিদেশি সংস্থা, আর ৪০ শতাংশ আসত সরকারের পক্ষ থেকে। সেটি বাতিল করার পর বিদেশি উৎস থেকে আর অর্থায়ন চাওয়া হয়নি। এমনকি টিকা কেনার জন্য রাজস্ব খাত থেকে যে বরাদ্দ নিতে হবে এবং পর্যায়ক্রমে তা টিকা কেনার ক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে হবে, সেটিও করা হয়নি। যার ফলে টিকার সংকট তৈরি হয়েছে এবং সময়ের পরিক্রমায় এখন হামের মহামারি রূপ দেখা দিয়েছে।
দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে যে সরকার থেকে হামের এই ছড়িয়ে পড়াকে মহামারী হিসেবে স্বীকার করা হচ্ছে না। অথচ নিকট অতীতে বা বৈশ্বিক অতিমারীর সময়ে বাংলাদেশ শুধু ওয়ান অফ দ্য বেস্ট ম্যানেজড স্টেটস-ই ছিল না, তথ্য প্রবাহও ছিল অবাধ ও উন্মুক্ত। উদাহরণ হিসেবে, জাতিসংঘেরআন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের (১৯৪৮) অনুচ্ছেদ ১৯-এ মানুষের মতামতের স্বাধীনতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, “প্রত্যেকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে।” তবে সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার এই অনুচ্ছেদ ১৯-ই ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল এ্যান্ড পটিলিক্যাল রাইটস-এ গ্রহণের সময় (১৯৬৬) জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা, জনআদেশ, জনস্বাস্থ্য এবং নৈতিকতার প্রশ্নে মতামত প্রদানকারীকে শ্রদ্ধাশীল হতে হবে বলে কিছু সংরক্ষণ জুড়ে দেয়া হয়। সোজা কথায়, জাতীয়-আঞ্চলিক-বৈশ্বিক পর্যায়ে যুদ্ধ বা অতিমারী ছড়িয়ে পড়লে বিদ্যমান জাতি-রাষ্ট্রসমূহের সরকাররা চাইলে অবাধ তথ্য প্রবাহের নাম্ েগুজব-অপপ্রচার-তথ্য বিকৃতির বিরুদ্ধে কিছু সেন্সরশিপ আরোপ করতে পারে। তবু কোভিডের সময় সরকার আন্তর্জাতিক এসব সনদের নীতিমালার কোন সুযোগ নেয়নি। তথ্য ও সেবা- দু’টোই পর্যাপ্ত ছিল।

অথচ আজ? দেশের ‘সরকারী বামপন্থী’ বা ‘সরকারী কম্যুনিস্ট’রা চুপ করে আছেন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশুদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চের পর থেকে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ৯০০টির বেশি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে (বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক, বৃহষ্পতিবার- ৯ই এপ্রিল)।
টিকাদানে ধস এখন দেশে হাম নির্মূলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হামের টিকাদানের হার নেমে এসেছে মাত্র ৫৭ দশমিক ১ থেকে ৫৭ দশমিক ২ শতাংশে, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এমআর-১ (হাম-রুবেলা) ও এমআর-২ টিকার কভারেজ ৯০ শতাংশের কাছাকাছি বা তার বেশি ছিল বলে ইপিআই সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে এই হার হঠাৎ ৬০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। এ পতন শুধু একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি সংক্রমণ বিস্তারের জন্য বাস্তব ও বিপজ্জনক শূন্যতা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা (বাংলা নিউজ স্পেশাল, ৩১শে মার্চ- ২০২৬)।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডক্টর লেনিন চৌধুরীর মতে, প্রতিবছর বাংলাদেশে ৩০ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে এবং জন্মের আগে-পরে এদের প্রায় ৯৮ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা হতো যা গত দেড় বছরে হয়নি। ভাবা যায়?
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশে এমআর টিকার সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। ৬৪ জেলায় এ সময় মোট চাহিদা ছিল ছয় লাখ ৪৬ হাজার ৪১০ ভায়াল (প্রতি ভায়ালে পাঁচ ডোজ) এর বিপরীতে সরবরাহ করা গেছে মাত্র এক লাখ ৭৭ হাজার ৪৫০ ভায়াল। এতে চাহিদার মাত্র ২৭.৪৫ শতাংশ পূরণ হয়েছে। অর্থাৎ, ৭২.৫৫ শতাংশ টিকার চাহিদা অপূর্ণ থেকে গেছে, যা মাঠ পর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রমে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে ইপিআইয়ের মাধ্যমে দেওয়া অন্যান্য টিকার মধ্যে পেন্টাভ্যালেন্ট, বাইভ্যালেন্ট ওরাল পোলিও (পওপিভি), বিসিজি, ইন-অ্যাকটিভেটেড পোলিও (আইপিভি), নিউমোকক্কাল কনজুগেট (পিসিভি) এবং টিটেনাস-ডিপথেরিয়া (টিডি) টিকার এই সময় চাহিদা ছিল ৫১ লাখ ৩৪ হাজার ৭৩ ভায়াল। সরবরাহ করা হয়েছে ২৫ লাখ ২৯ হাজার ৭৪০ ভায়ালের কিছু বেশি (কালের কণ্ঠ, ৯ই এপ্রিল- বৃহস্পতিবার)।

এদিকে দেশের সরকারী বাম বা কম্যুনিস্টরা চুপ করেই আছেন। তাদের কানে শিশুমৃত্যুর আর্তনাদ পৌঁছাচ্ছে না। এর চেয়ে ইরানের হরমুজ প্রণালী নিয়ে বেশি সরব হওয়াটাই ফ্যাশন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’-য় কিশোরী মেয়ে মতি কাহিনীর নায়ক ডাক্তার শশীকে বলে যে মা শেতলার দয়া হলে কলেরা এমনিতেই সেরে যাবে। টিকা নিয়ে আর কী হবে? মতি হয়তো টিকা দিতে ভয়ই পেতো।
গ্রামে গ্রামে ওলা বিবি বা ওলাইচন্ডী, মা শীতলার ভয়াবহ আগমনের গল্প আমরা শুনেছি দুই প্রজন্ম আগের নারীদের মুখে। গত দেড় বছরে দেশে সেক্টর কর্মসূচি বন্ধ থাকায় ৩৪টির বেশি উন্নয়ন কর্মসূচি বন্ধ হওয়ায় জন্ম নিয়ন্ত্রণ, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য সহ নানা খাতে সেবা বাধাগ্রস্থ হওয়ায় এবং ১৪ হাজার কম্যুনিটি ক্লিনিক ওষুধ, বেতন ও সেবা বন্ধজনিত সঙ্কটে পড়া দেশে ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, হেপাটাইটিস, ডেঙ্গু, এইডস, জলাতঙ্ক ও টিবি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বন্ধ হয়ে আমরা হয়তো ধীরে ধীওে ফিরে যাচ্ছি সেই অতীত সময়েই।