ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর যে “নতুন বাংলাদেশ”-এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তা ক্রমেই এক অনিরাপদ, অগোছালো ও জবাবদিহিহীন শাসনে রূপ নিয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা থাকলেও ক্ষমতার ভেতরে নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে; প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো অস্পষ্ট, জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে সিদ্ধান্তহীনতা প্রকট, আর কূটনীতিতে দৃঢ়তার বদলে আপসকামিতা দৃশ্যমান।
সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা, রোহিঙ্গা সংকট ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং মেয়াদ শেষের দিকে বিতর্কিত চুক্তির তোড়জোড়—সব মিলিয়ে এই সরকারকে অনেকেই “সংস্কারের সরকার” নয়, বরং “সংকটের সরকার” হিসেবেই দেখছে। আফনানের মৃত্যু এই অপশাসনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ফলাফল।
মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত টেকনাফের শিশু হুজাইফা আফনান (১২) ২৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। তার মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তার চরম দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির তীব্র সংঘর্ষের সরাসরি প্রভাব পড়ছে টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির গ্রামগুলোতে—রাতে গোলার শব্দে মানুষ ঘুমাতে পারে না, গুলি এসে পড়ছে ঘরবাড়ি ও চিংড়িঘেরে।
মংডু ও আশপাশের এলাকায় বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ বেড়েছে, ফলে সীমান্তজুড়ে অনিশ্চয়তা চরমে পৌঁছেছে। নাফ নদে বাংলাদেশি জেলেরা আর নিরাপদে মাছ ধরতে পারে না; চাষিরা মাঠে যেতে ভয় পায়। সীমান্তবাসীর জীবনে এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা হলো—কখন কোথায় গুলি এসে পড়বে, কেউ জানে না। অথচ সরকারের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ থেকেছে কেবল “উদ্বেগ প্রকাশে।”
২০১৭ সালে মানবিক কারণে বাংলাদেশ লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিলেও সময়ের সঙ্গে এই সংকট নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এবং মানব পাচার বেড়েছে। আরসা ও অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পভিত্তিক ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করেছে, যা স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
মিয়ানমারের যুদ্ধের কারণে শুধু নিরীহ রোহিঙ্গাই নয়, অস্ত্রধারী যোদ্ধা ও গোলাবারুদও বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ কার্যত একটি পরোক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রের প্রান্তভূমিতে পরিণত হয়েছে। সীমান্তে কার্যকর বাফার জোন বা শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছে।
আফনানের মৃত্যুর সঙ্গে অনিবার্যভাবে ফিরে আসে ফেলানীর নাম। ২০১১ সালে BSF-এর গুলিতে নিহত ফেলানীর বিচার আজও হয়নি; অভিযুক্ত খালাস পেয়েছে। বাংলাদেশ তখন প্রতিবাদ করলেও শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি। এই নীরবতা বারবার সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যাকে উৎসাহিত করেছে।
প্রতিবারই দেখা যায়—সীমান্তে বাংলাদেশি নিহত হয়, সরকার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়, কয়েক দিন মিডিয়ায় আলোচনা চলে, তারপর বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। আফনানও কি ফেলানীর মতোই আরেকটি “ভুলে যাওয়া নাম” হয়ে যাবে—এই প্রশ্ন আজ দেশের বিবেককে তাড়া করছে।
এমন সংকটময় সময়ে সরকার মেয়াদ শেষের দিকে এসে বেশ কিছু বিতর্কিত চুক্তির পথে এগোচ্ছে—বিশেষ করে জ্বালানি, সমুদ্রসম্পদ ও ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে। এসব চুক্তি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহ রয়েছে। নির্বাচিত সরকারের হাতে সিদ্ধান্ত না রেখে তড়িঘড়ি চুক্তি করা গণতান্ত্রিক রীতির পরিপন্থী।
প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য, নাকি বিদেশি স্বার্থ রক্ষার জন্য? যে রাষ্ট্র নিজের শিশুকে সীমান্তের গুলি থেকে রক্ষা করতে পারে না, তার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আফনানের মৃত্যু সেই নৈতিক সংকটকে নগ্নভাবে সামনে এনে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে বাংলাদেশকে কঠোর সীমান্ত নিরাপত্তা, শক্ত কূটনীতি, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আদালতে সীমান্ত হত্যার বিচার দাবি করতে হবে। একই সঙ্গে মেয়াদ শেষের ঝুঁকিপূর্ণ চুক্তি স্থগিত করা জরুরি।
আফনান শুধু একটি শিশু নয়—সে বাংলাদেশের সীমান্তের বিবেক। তার মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে তার মূল্য দেয় সবচেয়ে নিরীহ মানুষটি। ড. ইউনূসের সরকার যদি সত্যিই নতুন বাংলাদেশ গড়তে চায়, তবে তাকে সিদ্ধান্তহীনতা নয়—দৃঢ়তা, জবাবদিহি ও নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে ইতিহাস তাকে নীরবতার দায়ে অভিযুক্ত করবে।