সর্বশেষ

স্মরণ, স্বীকৃতি ও ইতিহাসের দায়

গণহত্যার সেই রাত: অন্ধকার ভেদ করে স্বাধীনতার সূর্যোদয়

প্রকাশিত: ২৪ মার্চ ২০২৬, ২৩:৩০
গণহত্যার সেই রাত: অন্ধকার ভেদ করে স্বাধীনতার সূর্যোদয়

১.

আমাদের স্বাধীনতার পূর্বরাত ২৫ মার্চ। এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি স্মরণীয় দিন। এক ভয়াল নিষ্ঠুরতার স্মৃতি হিসেবে চিহ্নিত। এর পর পরই ঘোষিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী একাত্তরের ২৫ মার্চে পরিকল্পিত পন্থায় নেমেছিল বাঙালি হত্যার মহোৎসবে, নেমেছিল রক্তের স্রোতে বাঙালির সব স্বপ্নকে ভাসিয়ে দিতে। আমরা জানি, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বাঙালির জীবন উৎসর্গ করার ঐতিহাসিক ঘটনার পথ ধরে এ দেশের মানুষকে পাড়ি দিতে হয় অনেক পথ। এই পথের ধারাবাহিকতায় আসে ’৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং আসে ১৯৭০ সালের নির্বাচন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে এবং সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু নির্বাচনের এই রায় দেখে চমকে যায় পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী স্বৈর-সামরিক চক্র। দেশের মানুষ ভোট দিয়েছিল ছয় দফার পক্ষে। সেই ছয় দফা পরিণত হয় এক দফায়। শুরু হয় এক অভূতপূর্ব আন্দোলন, অহিংস অসহযোগ আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্সে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) উত্তাল জনসমুদ্রে দিলেন এক ঐতিহাসিক ভাষণ। সংগ্রামের পূর্বাপর ইতিহাস তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তাঁর ওই ভাষণে ঘোষণা করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ দিলেন তিনি, নির্দেশ দেন শত্রুর মোকাবেলা করার। চলতে থাকে নানা চক্রান্ত। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন এবং সুকৌশলে আলোচনার নামে সৈন্য ও সমরাস্ত্র আনা শুরু করেন। এভাবে সুকৌশলে শুরু হয় কালক্ষেপণ। তারপর এক পর্যায়ে আসে ২৫ মার্চ। এই ২৫ মার্চের রাতে সশস্ত্র পাকিস্তানী বাহিনী হায়েনার মতো নেমে পড়ে গণহত্যায়। প্রথম পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বাসভবন এবং ছাত্রদের হল, রাজারবাগ পুলিশের হেডকোয়ার্টার, ইপিআর সদর দফতর, বিভিন্ন স্টেশন ও টার্মিনালে আক্রমণ চালানো হয়। ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালী হত্যার উৎসব শুরু হয় ওই রাতে। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের এক বর্বর সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যে গণহত্যার সূচনা করেছিল, পরবর্তী নয় মাস ধরে তা অব্যাহত ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায়। আজ সেই ২৫ মার্চ। ওই রাতের অগণিত শহীদসহ মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাসে প্রাণ উৎসর্গকারী সকল শহীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

 

২.

২০১৭ সালের ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করা এবং এ দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের পক্ষে একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আমরা গণহত্যার শিকার শহীদদের স্মরণ করা এবং গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ব্যক্ত করার একটি দিবস পেলাম। এই প্রস্তাব আরও আগেই গ্রহণ করা উচিত ছিল, তবে দেরিতে হলেও যে তা গৃহীত হয়েছে, সেটাও কম স্বস্তির বিষয় নয়। তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে এই দিবসের স্বীকৃতি আদায়ের চেয়েও বেশি প্রয়োজন একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও আমরা তা অর্জন করতে পারিনি। এর কিছু ভূরাজনৈতিক কারণ ছিল যা এখনো সম্পূর্ণভাবে দূরীভূত হয়নি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকে পরবর্তী নয় মাস ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যেসব হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, জাতিসংঘের গণহত্যার সংজ্ঞায় তা নিশ্চিতভাবেই গণহত্যা হিসেবে প্রমাণ করা সম্ভব। দেশি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষ্য–প্রমাণসহ অজস্র দলিল রয়েছে। সরকারি ও সংসদীয় পর্যায়ে জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করা অবশ্যই সম্ভব। ঘাতকদের প্রতি ঘৃণা এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পাশাপাশি এখন দরকার গণহত্যাকারীদের প্রকৃত পরিচয় জানা। আমরা মনে করি এজন্য প্রথমে দরকার গণহত্যার শিকার সকল শহীদকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া। সরকার পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী এই দেশের ঘাতকদের মুক্তিযুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের জন্য শাস্তি দিয়েছে, দিচ্ছে। এখন দরকার ২৫ মার্চের গণহত্যাকারী ঘাতকদের পরিচয় এবং তাদের শাস্তি। সরকার গণহত্যা দিবস ঘোষণার মাধ্যমে যে উদ্যোগ নিয়েছে তা প্রশংসার দাবিদার। আর তাই সকলেই অনুভব করছি একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রয়োজন। সেই পথ ধরে ২৫ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ হিসেবেও স্বীকৃতি পাবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।

 

৩.

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধের যুগে, যখন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এবং আরব বিশ্বের কয়েকটি ক্ষমতাধর দেশের সরকার। অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন লাভ করেছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো, কিউবা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের প্রতিবেশী ভারত, নেপাল, ভুটান প্রভৃতি দেশের। এই বিভাজনের আদর্শিক কারণ যদিও আর তেমন নেই, তবু একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ব্যাপারে পাকিস্তান ও তার মিত্র দেশগুলোর আপত্তি এখনো বিদ্যমান। এই পরিস্থিতিতে আমাদের উচিত রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপের সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো ও ভারতসহ আমাদের সেই দুঃসময়ের বন্ধুদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে আমরা আমাদের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আজও পাইনি। কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন প্রশাসন তথা নিক্সন-কিসিঞ্জারের ভূমিকা বহুল সমালোচিত। আমরা যদি অতীত থেকে শিক্ষা নিতে চাই তবে এই ভূমিকার আরও গভীর বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োজন হবে। দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার বইয়ে ক্রিস্টোফার হিচেন্স যেমন দেখিয়েছেন কিসিঞ্জারের হাতে কেবল বাংলাদেশের গণহত্যার রক্ত লেগে নেই, পূর্ব তিমুর, চিলি, আর্জেন্টিনাসহ কয়েকটি দেশের মানবতাবিরোধী নৃশংসতার পেছনেও কাজ করেছে তাঁর ইন্ধন ও মদদ। (গণহত্যা : জাতীয় গণহত্যা দিবস ও আন্তর্জাতিক দায়, মফিদুল হক, ২৬ মার্চ ২০১৭)

 

 

৪.

গণহত্যার ইংরেজি হিসেবে সাধারণত ‘জেনোসাইড’ (Genocide) বা ‘ম্যাস কিলিং’ (Mass Killing) ব্যবহার করা হয়। কিন্তু, শব্দ দুটির মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হল ‘ম্যাস কিলিং’ বা ‘ম্যাস মার্ডার’। আর বিশেষ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞকে বলা হয় ‘জেনোসাইড’। অপরাধ হিসেবে গণহত্যাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের The Convention on the Prevention and Punishment of the Crimes of Genocide বা জেনোসাইড কনভেনশনে। ওই সংজ্ঞায় গণহত্যার সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে এর যে পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে, সেগুলি হল: ‘কোনো গোষ্ঠীর মানুষকে হত্যা, তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতিসাধন, জীবনমানের প্রতি আঘাত ও শারীরিক ক্ষতিসাধন, জন্মদান বাধাগ্রস্ত করা এবং শিশুদের অন্য গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া।’ এর একটি বৈশিষ্ট্য থাকলেই সেটিকে গণহত্যা বলে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে চালানো গণহত্যায় উপরের পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে প্রথম চারটিই সংঘটিত হয়েছে।

 

৫.

Genocide বা গণহত্যা শব্দটির সংজ্ঞার্থ করা হয়েছে একটি জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা সমগ্র নৃগোষ্ঠীকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে পরিকল্পিতভাবে নির্মূল করার নৃশংস প্রক্রিয়া হিসেবে। শব্দটির বয়স বেশি নয়। এর উদ্ভাবক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ডের নাজি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষাকারী পোলিশ-ইহুদি আইনজীবী রাফায়েল লেমকিন। ১৯৪৪ সালে তিনি এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। অনেক শব্দের মতো এই শব্দটিও গ্রিক Genos (জাতি বা উপজাতি) এবং লাতিন cide (হত্যা করো)- এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে সৃষ্ট। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ২ ধারায়  (CPPCG) শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে :  ‘বর্তমান কনভেনশন গণহত্যার অর্থ জাতীয়, নৃগোষ্ঠী, জাতিগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশে নিয়োজিত নিম্নলিখিত কাজ, যেমন: এই সব গোষ্ঠীর কোনো সদস্যকে হত্যা; তাদের গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধন করা; পরিকল্পিতভাবে সম্পূর্ণ বা আংশিক বিনাশ সাধন করা; তাদের জন্মের ওপর ইচ্ছাপূর্বক প্রতিবন্ধকতা আরোপ করা এবং বলপূর্বক শিশুদের ধর্মান্তরিত করাকে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।’ আন্তর্জাতিক আইনে এবং জাতিসংঘের আদর্শের বিপরীতে এই নৃশংস কর্মকাণ্ড শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘গণহত্যা’ প্রচলিত রয়েছে।

 

৬.

গণহত্যা এতই মারাত্মক যে আন্তর্জাতিক আইন, চুক্তি বা কূটনীতির উৎস জাতিসংঘের ১৯৬৯ সালের ভিয়েনা কনভেনশন। সেখানেও গণহত্যাকে Jus Cogense বা সর্বমান্য আইনের আওতায় ফেলা হয়েছে। এই Jus Cogense-এর বিধান অনুযায়ী, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো অপরাধ কোনো রাষ্ট্র বা সরকার ক্ষমা করতে পারবে না, এমনকি কোন দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতেও এই অপরাধের ক্ষমা নেই। এতকিছুর পরও বাংলাদেশ এখনও গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সমর্থ হয়নি, উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা চলেছে, শহীদ ও নির্যাতিতের সংখ্যা নিয়ে চলছে দেশি-বিদেশি অপপ্রচার। অন্যদিকে আমাদের গণহত্যা নিয়ে কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের অন্তত সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হলেও, বাংলাদেশে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি পড়ানো হয়।

 

৭.

১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের সময় বাঙালি অধ্যুষিত এই ভূখণ্ডকে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার এই অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত কতটা ভ্রান্ত ছিল, তার প্রমাণ পেতে আমাদের তিন মাসের বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। তিন মাসের মাথায়ই প্রথম বিরোধ তৈরি হয় ভাষা নিয়ে, যা ছিল অনিবার্য। যাদের সঙ্গে আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি-কৃষ্টি-ঐতিহ্যের কোনো সাদৃশ্য নেই, তাদের সঙ্গে এই সংঘাত ছিল অনিবার্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিকল্পিত বৈষম্য নির্মাণ। অর্থনৈতিক সমতা, চাকরিপ্রাপ্তি, শাসনক্ষমতায় অংশীদারি, রাজনৈতিক অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল অতিসাধারণ বিষয়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে পরাজয়ের ফলে উর্বর এই ভূখণ্ড হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক পশ্চিম পাকিস্তানিরা মেনে নিতে পারছিল না। ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানে পাকিস্তানি জেনারেলরা এক সভায় মিলিত হন, যেখানে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘Kill three million of them’. পরে যুদ্ধের সময় সেই ঘোষণাই কি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল? এই তথ্যটি Robert Payne তাঁর Massacre [1972] গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। ওই গ্রন্থেই তিনি লিখছেন : ‘Within a week, half the population of Dacca had fled, and at least 30,000 people had been killed. Chittagong, too, had lost half its population. All over East Pakistan people were taking flight, and it was estimated that in April some thirty million people [!] were wandering helplessly across East Pakistan to escape the grasp of the military.’ বাঙালি জনগোষ্ঠীই যে এই আক্রমণের লক্ষ্য ছিল, সে কথা Anthony Mascarenhas তাঁর ‘The Rape of Bangladesh’ ও R. J. Rummel তাঁর ‘Death By Government’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। যাঁরা মূলত লক্ষ্য ছিলেন তাঁরা হলেন- সেনাবাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, প্যারামিলিটারি, আনসারে কর্মরত বাঙালি; হিন্দু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মী; কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র; বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও নিরীহ জনগণ। নারীদের সম্ভ্রমহানির যে সংখ্যার উল্লেখ করা হয়ে থাকে, তার সমর্থন পাওয়া যায় Susan Brownmiller-এর ‘Against Our Will : Men, Women and Rape’ গ্রন্থে। পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা চিনে এবং জার্মানরা রাশিয়ায় যত নারীকে ধর্ষণ করেছিল, তার সংখ্যা যথাক্রমে দুই, তিন ও চার লাখ ছিল। বিভিন্ন গ্রন্থে ধর্ষিত নারীদের বয়স নিয়ে ভয়াবহ যে তথ্য পাই, তা শুনলে ঘৃণায় বমি চলে আসে। ধর্ষিত নারীদের বয়স ছিল আট থেকে ৭৫। নিহতদের সংখ্যা নিয়ে R. J. Rummel যে তথ্য দিয়েছেন, তাতে সংখ্যাটি স্বীকৃত সংখ্যার মতোই। তিনি তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ২৬৭ দিনে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় এক লাখ, খুলনায় এক লাখ ৫০ হাজার, যশোরে ৭৫ হাজার, কুমিল্লায় ৯৫ হাজার, চট্টগ্রামে এক লাখসহ আরো ১৪টি জেলায় ১২ লাখ ৪৭ হাজার মানুষ হত্যা করে। তার মতে, প্রতি ২৫ জনের মধ্যে একজন বাঙালিকে হত্যা করা হয়। তাহলে সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে ৩০ লাখ মানুষকেই হত্যা করা হয়েছে। আর এই হত্যাকাণ্ড কোনো তরুণ সামরিক অফিসার বীরত্ব বা লক্ষ্যভেদের দক্ষতা দেখানোর জন্য করেনি; বরং উচ্চপদস্থ দক্ষ অফিসারদের ঠাণ্ডা মাথার পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটিয়েছেন। যাঁদের নাম Robert Payne তাঁর Massacre [1972]  উল্লেখ করেছেন তাঁরা হলেন- আইয়ুব খান, জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল পীরজাদা, জেনারেল উমর খান, ইন্টেলিজেন্স চিফ জেনারেল আকবর খান। উল্লেখ্য, তখন আমেরিকা পাকিস্তানকে ৩.৮ মিলিয়ন ডলারের সামরিক অস্ত্র-সরঞ্জাম প্রদান করেছিল।

 

৮.

গণহত্যার সংখ্যা নিয়ে অপরাধীচক্র সব সময়ই বিভ্রান্তি তৈরি করে থাকে। অস্বীকৃতি বা সংখ্যাস্বল্পতা প্রমাণ করতে পারলেই কী অপরাধ লঘু হয়ে যায়! সেই প্রচেষ্টাও কি অপরাধের মধ্যে গণ্য হতে পারে না? পৃথিবীতে যত গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার মধ্যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা নৃশংসতায় সব কিছুকে হার মানিয়েছে। হত্যার নিত্যনতুন কৌশল ও পদ্ধতি মানুষকে শুধু বিস্ময় বিমূঢ় করেনি, তার চেতনাকে অবশ করে দিয়েছে। এই সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব শুধু বাঙালি লেখক বা গবেষকরা দেননি, যাকে একপেশে বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়। এই উদ্ধৃতিগুলো তুলে ধরার একটিই উদ্দেশ্য যে নিরপেক্ষ বিদেশিরাও এর সত্যতা খুঁজে পেয়েছেন এবং নিরপেক্ষভাবে তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান কখনোই এই সত্য স্বীকার করেনি। রাষ্ট্রীয়ভাবে মিথ্যাচার করেছে। গণহত্যার খলনায়কদের বিচার তো দূরের কথা, তাঁদের মর্যাদার সঙ্গে রক্ষা করেছে। এমনকি আমাদের ভূখণ্ডে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিকভাবে বাধার সৃষ্টি করেছে, নিজেদের সংসদে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করেছে, যা একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। সম্প্রতি আইএসআইয়ের মদদে ‘Creation of Bangladesh : Myths Exploded’ শিরোনামে Junaid Ahmed এক গ্রন্থ লিখেছেন, যেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক গণহত্যার বিষয়টিকে সরাসরি অস্বীকার করে মুক্তিসেনাদের ওপর দায় চাপানো হয়েছে। সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে কাজটি করে পাকিস্তানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে সেই বই সরবরাহ করার চরম ধৃষ্টতাও দেখিয়েছে। যেখানে একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য বারবার পাকিস্তানকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে, সেখানে পরিকল্পিতভাবে অতীতের কৃতকর্মকে অস্বীকার করার ধৃষ্টতাকে আন্তর্জাতিকভাবে আইনের আওতায় আনা যায় কি না তার কৌশল নিয়ে সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

 

৯.

আমরা দেখেছি, গণহত্যা সম্পর্কিত প্রশ্ন এর আগেও পাকিস্তানের পদস্থ কর্মকর্তারা এড়িয়ে গেছেন। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে এ ব্যাপারে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘কাভি কাভি আসমান কা রং বদলতি হ্যায়।’ অর্থাৎ উনি বোঝাতে চেয়েছেন যে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আমরা এসব বলে চলেছি। এই ধৃষ্টতা তারা দেখিয়েই চলেছে। কিন্তু হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত পাকিস্তানের নিজস্ব তদন্ত কমিশন সেই সময়ই সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত নৃশংসতার যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছিল এবং ১৯৫ জন সেনা কর্মকর্তা গণহত্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল। এই রিপোর্ট ভুট্টোর হাতে তুলে দিলেও নিজের ক্ষমতালিপ্সার কারণে তিনি তা প্রকাশ করেননি এবং এই সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের কোনো ব্যবস্থা করেননি। ২০০০ সাল পর্যন্ত- অর্থাৎ ২৮ বছর এই রিপোর্ট চাপা ছিল। কিন্তু তা প্রকাশ হওয়ার পরও পাকিস্তান তা অস্বীকার করে চলেছে। এই রিপোর্টে সবচেয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য ছিল যে আওয়ামী লীগের কর্মী বা অন্য কোনো পক্ষ এমন কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেনি, যাতে করে সেনাবাহিনীকে তা দমনে এতটা নৃশংস পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হতে পারে। কমিশন লে. জে. এ এ কে নিয়াজি, মেজর জেনারেল জামশেদ, মেজর জেনারেল রহিম খান, ব্রিগেডিয়ার বাকির সিদ্দিকী, ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ হায়াত, ব্রিগেডিয়ার আসলাম নিয়াজি, জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জেনারেল আবদুল হামিদ খান এবং মেজর জেনারেল খুদা দাদ খানের বিরুদ্ধে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেছিল। এই কমিশন সিরাজগঞ্জের ন্যাশনাল ব্যাংক ট্রেজারি থেকে ১.৩৫ কোটি টাকা লুট করার জন্য ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব, লে. ক. মুজাফ্ফর আলী জাহিদ, লে. ক. বাসারাত আহমদ, লে. ক. তাজ, ও মেজর মাদাদ হোসেনকে দায়ী করেছিল। কিন্তু ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে কমিশন রিপোর্ট জমা দিলে ভুট্টো দেখলেন যে উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তারা ফেঁসে যাচ্ছেন, আর তাঁদের বিচার করা হলে তাঁর ক্ষমতায় থাকা অসম্ভব, তাই তিনি প্রতিবেদনটি একেবারেই চাপা দিয়ে দেন। পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হোসেইন হাক্কানি, যিনি বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরিফ- দুজনেরই উপদেষ্টা ছিলেন, তাঁর গ্রন্থ ‘Pakistan : Between Mosque and Military’-তে লিখেছেন : “To avoid embarrassing the army, Bhutto kept secret the report of an inquiry commission examining the loss of East Pakistan. The release of the report soon after Pakistan's split would have been devastating for Pakistan's army. By withholding the report, Bhutto did the military a favor.’ (সেনাবাহিনীকে বিব্রত না করার জন্য ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষতি নিরূপণে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনটি চেপে রাখেন। পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার অব্যবহিত পরেই এই রিপোর্ট  প্রকাশ পেলে তা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য চরম বিপর্যয়ের হতো। এটা গোপন রেখে তিনি সেনাবাহিনীকে একটি সুবিধা দিয়েছিলেন।) ২০১৩  সালের ১৯ নভেম্বর গ্রে বাস The New Yorker  পত্রিকায় Looking Away from Genocide শিরোনামের এক নিবন্ধে জানাচ্ছেন, সিআইএ ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের হিসাবে ১৯৭১-এর গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ২০ লাখ আর বাংলাদেশের অফিশিয়াল হিসাব ৩০ লাখ। গ্রে বাস তাঁর গ্রন্থে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও কিসিঞ্জারের মধ্যে টেলিগ্রামের কথোপকথন তুলে ধরে দেখাচ্ছেন যে গণহত্যা দমনে পাকিস্তান জেনারেলদের ওপর কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগে প্রেসিডেন্ট নিক্সন অস্বীকৃতি জানান। রেকর্ডৃকৃত ফিতা থেকে তাদের কথোপকথন তুলে ধরে তিনি দেখাচ্ছেন যে যখন নির্মম গণহত্যা চলছে, তখন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ইয়াহিয়া খানকে পরিচ্ছন মানুষ হিসেবে প্রশংসা করছেন।

 

WHITE HOUSE TAPES

OVAL OFFICE 477-1/APRIL 12, 1971, 10:24-10:33 a.m.

Nixon : Now, another thing. I want to know about Yahya and Pakistan.

“Nixon had a great personal fondness for Pakistan’s military ruler, who was carrying out the brutal crackdown on the Bengalis. ‘He’s a decent man’, Nixon repeatedly said, as the death toll mounted.”

 

গণহত্যার অজস্র দালিলিক প্রমাণ সত্ত্বেও এই অস্বীকৃতির অপরাধে জড়িত ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার এখনই সময়। তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হচ্ছে, ভুল ইতিহাস শেখার সঙ্গে সঙ্গে ভুল রাজনীতির পাঠ নিচ্ছে। ভ্রান্তির চোরাবালিতে পা দিয়ে তারা একদিন হারিয়ে যাবে, রেখে যাবে মিথ্যার জঞ্জাল। রাষ্ট্র এবং একটি জাতি যাতে পথ না হারায়, তার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চা ও সংগ্রাম- দুটোই জারি রাখা দরকার।  

 

১০.

বঙ্গবন্ধুর পার্সনাল এইড হাজী গোলাম মোরশেদের সাক্ষাতকারেও গোপন ট্রান্সমিটার ও সেটি ব্যবহার করে দেয়া ঘোষণার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। শারমিন আহমদের ‘তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা’ শিরোনামে লেখা বইতে যুক্ত করা সাক্ষাৎকারে গোলাম মোরশেদ বলেছেন, ‘আমি সোজা ওপরে উঠে গেলাম। ওপরে ওঠে দেখি বঙ্গবন্ধু পাইপ হাতে বসে আছেন। আমি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আমরা স্বাধীন হয়ে গেলাম। 'They are coming to arrest me. I have decided to stay.’ তখন রাত সাড়ে দশটার মতো বাজে বলে জানান গোলাম মোরশেদ। এর পরের ঘটনাবলী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাত ১১টা বেজে গেল, বারোটা প্রায় বাজে বাজে, এমন সময় একটা টেলিফোন আসল। বলে, ‘আমি বলদা গার্ডেন থেকে বলছি। মেসেজ পাঠান হয়ে গিয়েছে, মেশিন নিয়ে কী করব?’ আমি মুজিব ভাইয়ের কাছে দৌড়ে গেলাম, বললাম যে ফোন এসেছে- ‘মেসেজ পাঠান হয়ে গিয়েছে। মেশিন নিয়ে আমি কী করব?’ উনি বললেন, ‘মেশিনটা ভেঙ্গে ফেলে পালিয়ে যেতে বলো।’ এই মেশিন মানে, গোপন ট্রান্সমিটার বলেই ধারণা করছেন গবেষকরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পাশাপাশি এইসব মেশিন ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে গণহত্যার খবর বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন। ট্রান্সমিটার ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আরও ব্যাপক বিস্তৃত গবেষণা এখন চলছে। গবেষণার কাজটি করছেন ফিরোজ মাহমুদ। এই গবেষণার মধ্য দিয়ে আরও অনেক অজানাকে, অল্প ও অস্পষ্ট জানাকে স্পষ্ট করা সম্ভব হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

 

১১.

গণহত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় অর্থাৎ এই অপরাধ যে কালে যে ভূখণ্ডে সংঘটিত হোক না কেন, তা সর্বকালে সর্বস্থানে সর্বজনের বিরুদ্ধে তথা গোটা মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ। ‘জেনোসাইড’ বলতে যে ভয়ংকর নৃশংসতা বোঝায়, তা মোকাবিলায় বিশ্বসমাজের অবস্থান প্রকাশ পায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের কঠোরতায়। আর তাই ২৫ মার্চ জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস ঘোষিত হলেও এর রয়েছে আন্তর্জাতিক তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দিবসটি ঘিরে আয়োজন বহন করে বিশেষ গুরুত্ব। এখানে স্মর্তব্য, গণহত্যার শিকার মানুষদের স্মরণ ও গণহত্যা প্রতিরোধে জাতিসংঘ ২০১৫ সালে সর্বসম্মতভাবে প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর গণহত্যা স্মরণ দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৮ সালের এই দিনে জেনেভায় জেনোসাইড কনভেনশন গৃহীত হয়েছিল, একান্তভাবে সেই দিনটিকে তাই জাতিসংঘ বেছে নিয়েছে বিশ্বব্যাপী গণহত্যা স্মরণ ও প্রতিরোধের দিন হিসেবে। এর পাশাপাশি জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস পালন করছে গণহত্যার শিকার কতক জাতি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সংঘটিত হলোকাস্ট, আর্মেনিয়া কিংবা রুয়ান্ডার গণহত্যা স্মরণে রয়েছে আলাদা জাতীয় দিবস। এক্ষণে বাংলাদেশও যুক্ত হলো এমনি আরও কতক জাতীয় উদ্যোগের সঙ্গে। আশা করা যায় জাতীয়ভাবে দিবসটি পালনের পাশাপাশি সবাই আবার একত্র হবে আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যা স্মরণ দিবস উদযাপনে।

 

১২.

‘গণহত্যা দিবস’ কেন? এই প্রশ্নকে সামনে রেখে ‘পাকিস্তানি নিষ্ঠুরতা ও ইতিহাসের দায়বদ্ধতা’ প্রবন্ধে মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক, সাংবাদিক হারুন হাবীব লিখেছেন, ইংরেজি ‘জেনোসাইড’ শব্দটি ‘গণহত্যা’ হিসাবে বাংলায় স্বীকৃত, যার অর্থ বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠী বা ধর্ম, বর্ণ ও বিশ্বাসের মানুষের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত পন্থায় পরিচালিত ব্যাপক হত্যাকান্ড, আক্রমণ ও পীড়ন, এবং যা সেই জনগোষ্ঠীকে আংশিক অথবা সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। জাতিসংঘের ১৯৪৯ সালের ‘জেনোসাইড কনভেনশন’ও এই সংজ্ঞার স্বীকৃত আছে। সে কারণে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের হাতে যে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ ঘটে, তা সব অর্থেই ‘গণহত্যা’ বা ‘জেনোসাইড’ ।

 

 

১৩.
‘গণহত্যা দিবস’ কেন? ইতিহাসের ভয়ঙ্কর এক হত্যাযজ্ঞের ট্র্যাজেডি ধারণ করে ২৫ মার্চ বাংলাদেশের মানুষের কাছে ‘কালরাত্রি’। অনেক বছর ধরেই দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানবতাবাদী মানুষ। কারণ এ দিন থেকেই সূত্রপাত ঘটে প্রায় নয় মাসের নিষ্ঠুরতা, যাতে সর্বমোট ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হন। রবার্ট পেইন তার ‘Massacre, The Tragedy of Bangladesh’ বইতে ইয়াহিয়া খানের উদ্ধৃতি দেন : “Kill three million of them and the rest will eat out of our hands”. ১৯৮১ সালে জাতিসংঘ সংস্থার এক রিপোর্টে বলা হয়, “Among the genocides of human history, the highest number of people killed in lower span of time is in Bangladesh in 1971. An average of 6000 (six thousand) to 12 000 (twelve thousand) people were killed every single day….This is the highest daily average in the history of genocide’s…”

 

১৪.

মাত্র নয় মাসে এবং যে দ্রুততায় মানুষ মারা হয়েছে বাংলাদেশে তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসখ্যানে দেখা গেছে, দৈনিক গড়ে ৬০০০ মানুষ খুন করা হয়েছে মাত্র ২৬০ দিনে। কমোডিয়ার এই হার ছিল ১২০০। একমাত্র চুকনগরেই ২০ মে ১৯৭১ সালে একদিনে ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ২৫ মার্চের অভিযানটি শুরুর আগে প্রতিটি বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকা থেকে বের করে দেয়া হয়। স্থানীয় প্রচার মাধ্যমের উপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। এর পরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক লুকিয়ে থাকেন। তাদেরই একজন সাইমন ড্রিং। তিনি ৩১ মার্চ লন্ডনের ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’এ তার প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেদন প্রকাশিত করেন। দীর্ঘ প্রতিবেদনের শুরু এ রকম: ২৫ মার্চ মধ্যরাতের পর ঢাকা মহানগরী মুহুর্মুহু তোপধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে থাকে। সর্বত্র বোমা বারুদের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। টিক্কা খান বর্বর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে নির্মমভাবে গণবিদ্রোহ দমনে সচেষ্ট হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ হেড কোয়ার্টার, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর প্রধান কার্যালয় পিলখানা সেনা-অভিযানে বিধ্বস্ত হয়। নিরস্ত্র মানুষের উপর সেনাবাহিনী নির্বিচারে ভারী আর. আর. গান,স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ব্যবহার করে। ইকবাল হলকে তারা প্রধান আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। সেখানে প্রথম ধাক্কাতেই ২০০ ছাত্র নিহত হয়। একদিকে হলগুলোর দিকে উপর্যপুরি শেল নিক্ষেপ করা হতে থাকে অন্যদিকে চলতে থাকে মেশিনগানের গুলি। দু’দিন পর্যন্ত পোড়া ঘরগুলোর জানালা-দরজায় মৃতদেহ ঝুঁলে থাকতে দেখা যায়। পথে ঘাটে মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। জগন্নাথ হলেও বর্বরোচিত আক্রমণ চালানো হয়। কয়েক শত ছাত্র, যারা প্রায় সকলেই হিন্দু ধর্মালম্বী, নিহত-আহত হয়। সৈন্যরা মৃতদেহগুলোকে গর্ত খুঁড়ে গণকবর দেয়। এরপর ট্যাঙ্ক চালিয়ে মাটি সমান করে। রিপোর্টটির একটি অংশ এ রকম: ‘আল্লাহ ও পাকিস্তানের ঐক্যের নামে’ ঢাকা আজ এক বিধ্বস্ত ও সন্ত্রস্ত নগরী।’

 

১৫.

ঢাকার মাটিতে একমাত্র ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তান বাহিনীর হাতে ১ লাখ মানুষ নিহত হয় বলে সিডনি মর্নিং হেরাল্ড বিবরণ দেয়। নয় মাসব্যাপী বর্বরতায় পাকিস্তান বাহিনী ও তাদের দোসরেরা তিন লক্ষাধিক নারীকে ধর্ষণ করে, ধ্বংস করে জনপদ। কাজেই ইতিহাস রক্ষাই শুধু নয়, পাকিস্তানি অপপ্রচারের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবার দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও জরুরি। সেনাবাহিনীর অপকর্ম ঢাকতে পাকিস্তান যা করে চলেছে তা তার আরেক ঐতিহাসিক পাপ, এতে সত্যের নড়চড় হবার সুযোগ নেই। ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে দিনটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি বেগবান হবে।

 

১৬.

একাত্তরের গণহত্যা ও নির্যাতনকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও গণসচেতনতা। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের উদ্যোগী হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে সাম্প্রতিক সময়ে ২৫ মার্চকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গণহত্যা দিবস পালনের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি। রাষ্ট্রীয়ভাবে গণহত্যা দিবসের পালনের পরপরই আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হবে ১৯৭১ সালের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়। বাংলাদেশের গণহত্যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে বর্তমান সরকার ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেটি আরও গ্রহণযোগ্যতা পাবে, এটি নিয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অপপ্রচারকারীদের জলঘোলার সুযোগ কমে যাবে। ১৯৭১ সালে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন যাঁরা তাঁদের সবার প্রতি আবারো গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

 

(তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া, অস্বীকৃতির অপরাধ : শরীফ আতিক-উজ-জামান, দৈনিক কালের কণ্ঠ, দৈনিক সমকাল, দৈনিক প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট)

 

লেখকঃ মহুয়া মোহাম্মদ, গণমাধ্যমকর্মী

সব খবর

আরও পড়ুন

মহাজনের মরীচিকা ও রোহিঙ্গা শিবিরের ‘সেমাই-বিপ্লব’

মহাজনের মরীচিকা ও রোহিঙ্গা শিবিরের ‘সেমাই-বিপ্লব’

এক চিরস্থায়ী হাহাকারের উপাখ্যান

অপ্রাসঙ্গিকতার প্রাসঙ্গিকতা এক চিরস্থায়ী হাহাকারের উপাখ্যান

সংকটে দেশের জন্য কার্যকর প্রমাণিত শেখ হাসিনার উদ্যোগ

মৈত্রী পাইপলাইন এখন জ্বালানি নিরাপত্তার ভরসা সংকটে দেশের জন্য কার্যকর প্রমাণিত শেখ হাসিনার উদ্যোগ

বিক্রির হিসেব নিয়ে একাডেমির শুভঙ্করের ফাঁকি, দেনা নিয়ে ঘরে ফিরছেন প্রকাশক

কেমন হলো একুশের বইমেলা? বিক্রির হিসেব নিয়ে একাডেমির শুভঙ্করের ফাঁকি, দেনা নিয়ে ঘরে ফিরছেন প্রকাশক

গণতন্ত্রের চড়ুইভাতি ও একবিংশ শতাব্দীর মহাহাস্যকর মহড়া

সঙ-সদ গণতন্ত্রের চড়ুইভাতি ও একবিংশ শতাব্দীর মহাহাস্যকর মহড়া

রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা, টেনিসনের ‘দ্য প্রিন্সেস’ এবং আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাংলাদেশের নারীর অবস্থান

রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা, টেনিসনের ‘দ্য প্রিন্সেস’ এবং আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাংলাদেশের নারীর অবস্থান

মধ্যপ্রাচ্যের দাবার ছক ও বঙ্গীয় তৌহীদি জনতার বিপাক

মধ্যপ্রাচ্যের দাবার ছক ও বঙ্গীয় তৌহীদি জনতার বিপাক

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ স্বাধীনতার সংগ্রামের অমর আহ্বান

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ স্বাধীনতার সংগ্রামের অমর আহ্বান