জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩ ঘোষণা হওয়ার পরপরই প্রশংসার বদলে বিতর্কে জড়িয়েছে একটি সিদ্ধান্ত। চিত্রনাট্য না লিখেও ‘শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার’ বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন ‘রক্তজবা’ সিনেমার পরিচালক নিয়ামুল মুক্তা। বিষয়টি সামনে আসতেই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি নিজেই। এতে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নীতিমালা মানা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ২৮টি বিভাগে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে। সেখানে ‘রক্তজবা’র জন্য নিয়ামুল মুক্তার নাম ওঠে সেরা চিত্রনাট্যকার হিসেবে। কিন্তু ঘোষণার একদিনের মধ্যেই ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, এই সিনেমার চিত্রনাট্য তার লেখা নয়; লিখেছেন সহকারী পরিচালক মুহাম্মাদ তাসনীমুল হাসান তাজ। “আমি যে কাজ করিনি, তার জন্য পুরস্কার গ্রহণ করা সম্ভব নয়,” জানিয়ে সম্মানটি তাজের হাতে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সিনেমার টাইটেল কার্ডেও চিত্রনাট্যকার হিসেবে তাজের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এমন স্পষ্ট তথ্য থাকা সত্ত্বেও কীভাবে জুরি বোর্ড বা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত তালিকায় এই ভুল হলো? জুরি সদস্য ওয়াহিদ সুজন বলেন, প্রাথমিক ফরম ও তথ্য যাচাইয়ে বিভ্রান্তি হতে পারে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।
বিতর্ক এখানেই থামেনি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের নীতিমালা অনুযায়ী, বিবেচ্য বছরে চলচ্চিত্রকে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে হবে। অথচ ‘রক্তজবা’ মুক্তি পেয়েছে শুধু ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আইস্ক্রিনে। প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের প্রমাণ নেই। তবুও এটি পুরস্কারের তালিকায় এসেছে, যা নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।

নীতিমালা না মেনে কীভাবে সিনেমাটি পুরস্কার পাচ্ছে, প্রশ্ন রাখা হয়েছিল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘জুরিবোর্ডের’ দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তার কাছে। তিনি বলেন, “আমি ঠিক জানি না, নীতিমালাটা দেখতে হবে। চলচ্চিত্র পুরস্কার কারা পাচ্ছেন এই সিদ্ধান্ত উচ্চপর্যায় থেকে নেওয়া হয়েছে, একদম উপদেষ্টা থেকে নেওয়া হয়েছে, কেবিনেট ডিভিশন থেকে সিনেমাগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে। আমাদের এখানে কোনো ভূমিকা ছিল না এবং কোনো কথাও নাই এ ব্যাপারে।”
জুরিবোর্ডের সদস্য হয়েও এই সম্পৃক্ততা নেই কেন প্রশ্নে ওই কর্মকর্তা বলেন, “পুরো প্রক্রিয়ায় আমরা ছিলাম, কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তেই ওরকম হয়েছে। এখন এই বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে, সেটাও আমি ঠিক জানি না। জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া ঘাঁটলে হয়ত বোঝা যাবে, কোথায় ভুল আছে।”
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অনেকে বলছেন, এটি শুধু একটি ‘ভুল’ নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতিফলন। বিশেষ করে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর অধীনে এমন বিতর্কিত ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তকে অনেকে ‘আরেকটি অদ্ভুত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, একটি সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার এখন প্রশ্নবিদ্ধ যা চলচ্চিত্রাঙ্গনের মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করেছে।